বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোন কাজে এটি ব্যবহার করা যাবে, কোথায় ব্যবহার করা যাবে না এবং কোথায় এআই ব্যবহারের বিষয়টি জানাতে হবে—তা স্পষ্ট করে নীতিমালা তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ‘অ্যাকাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টিগ্রিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরামর্শ দেন।
এআই ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘এআই ডিসক্লোজার স্টেটমেন্ট’ চালুর পরামর্শ দিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, নীতিমালায় কোন এআই টুল কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এআই থেকে পাওয়া তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা উল্লেখ থাকতে হবে।
এআইয়ের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শুধু এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীর নিজস্ব শেখা, চিন্তা ও কাজের প্রক্রিয়া মূল্যায়নের পরামর্শ দেন তিনি।
মৌখিকভাবে কাজের ব্যাখ্যা নেওয়া, গবেষণার খসড়া ও নথি সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের মতো পদ্ধতি চালুরও পরামর্শ দেন অধ্যাপক মামুন আহমেদ।
এআই ও অ্যাকাডেমিক অসততা মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য চারটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন তিনি। এগুলো হলো—এআই ব্যবহারে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, পদোন্নতিতে গবেষণার সংখ্যার পরিবর্তে মানকে গুরুত্ব দেওয়া, গবেষণার সততা ও যথাযথ উদ্ধৃতি বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোর্স চালু এবং গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি ও এআই-সহায়তা শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো।
পদোন্নতিতে গবেষণার মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পাঁচটি নিম্নমানের গবেষণাপত্রের চেয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মানসম্মত গবেষণাপত্র বেশি মূল্যবান। শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতা থেকে ‘গবেষণা প্রকাশ কর, নইলে পিছিয়ে পড়বে’ সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই প্রবণতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নিম্নমানের বা প্রিডেটরি জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করছেন এবং এআই ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য-উপাত্ত তৈরি করছেন উল্লেখ করে তিনি এসব বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
গবেষণার সততা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার আহ্বান জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিষয় যাই হোক, স্নাতক হওয়ার আগে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে গবেষণার সততা ও যথাযথ উদ্ধৃতি বিষয়ে একটি বাধ্যতামূলক কোর্স করতে হবে।
একাডেমিক ও গবেষণার সততা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। এতে চৌর্যবৃত্তি, লেখকত্ব, তথ্য ব্যবস্থাপনা, নৈতিক অনুমোদন, স্বার্থের সংঘাত, গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, এআই নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রযুক্তিটি দায়িত্বশীল ও নৈতিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এআই শিক্ষা ও গবেষণার কাজ দ্রুত করতে পারে, তবে এটি ভুল তথ্য ও সূত্র দিতে এবং পক্ষপাত ছড়াতে পারে।
‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল কোনো উত্তরের দায় নিতে পারে না। তাই এর মাধ্যমে তৈরি ফলাফলের দায়িত্ব আমাদেরই,’ বলেন তিনি।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রযুক্তি মানুষকে আরও বুদ্ধিমান করবে, অলস নয়। বাংলাদেশকে বিশ্বমানের গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করতে হলে গবেষণার সততা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য রাশেদা কে চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ এম ইউসুফ হায়দার, টার্নিটিনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক চৈতালি মিত্র এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী বক্তব্য দেন। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।