মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলো যুদ্ধের সম্মুখসারিতে এসে পড়েছে। সার্বভৌমত্ব ও অবকাঠামোয় আঘাতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছে দেশগুলো। এখনও সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও আবার হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত বিমান হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে তেহরান। এসব হামলায় আরব ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি দেশগুলোর বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোও ধ্বংস হয়েছে।
এর ফলে নিরাপদ পর্যটন ও আর্থিককেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা উপসাগরীয় অঞ্চলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পাশাপাশি দেশগুলোর তেল ও গ্যাস শিল্পেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, আরব দেশগুলো এই যুদ্ধ চায়নি এবং তা ঠেকাতে চেষ্টা করেছিল। তবে ইরানের এই হামলা অব্যাহত থাকলে শেষ পর্যন্ত তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কি না—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, ‘সব সীমা ইতোমধ্যেই অতিক্রম হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। আমাদের অবকাঠামোর ওপর হামলা হচ্ছে। আমাদের আবাসিক এলাকাগুলোতেও হামলা হচ্ছে। এসব হামলার প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। সম্ভাব্য প্রতিশোধে প্রশ্নে আমাদের নেতৃত্বে সব বিকল্পই খোলা আছে। তবে আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এ ধরনের হামলা চলতে থাকলে আমরা কোনোভাবেই চুপ করে বসে থাকব না।’
আরব অঞ্চলজুড়ে বেশিরভাগ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হলেও ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে অগ্নিকাণ্ড এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ড্রোনগুলো সহজেই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করছে। ফলে বড় ধরনের ক্ষতি না করলেও বাণিজ্য ও ভ্রমণব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটাই ইরানের রণকৌশল। প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে চায়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ইসরায়েলে যে পরিমাণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, তার প্রায় সমপরিমাণ ছুড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্য ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই দেশটি ইরানের হামলার বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান চাইলে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস শিল্পকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
তবে তেহরানের এই কৌশল উল্টো ফলাফলও বয়ে আনতে পারে। কারণ ইরানের এ ধরনের পদক্ষেপ উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলতে পারে, এমনকি যেকোনো পর্যায়ে তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশও নিতে পারে। এখন পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানোর অনুমতি দেয়নি। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো একপর্যায়ে তারা সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
যদিও এখনও সে অবস্থায় পৌঁছায়নি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। আপাতত তারা প্রতিরক্ষার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। অবশ্য যুদ্ধ কত দিন চলবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে সংঘাতে ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হোক—এমনটিও চায় না তাদের অনেকে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের গাজা আগ্রাসন এবং লেবানন ও সিরিয়ার মতো দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ আরব দেশগুলোর সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করেছে। গত বছর হামাসের শীর্ষ নেতাদের হত্যাচেষ্টা করতে গিয়ে কাতারে বোমা হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি আরব দেশগুলো। ওই ঘটনার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল তারা।
তবে ইরানের হামলার ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যে ঐক্য জোরদার হচ্ছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সময় রবিবার (১ মার্চ) জরুরি বৈঠকে বসে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয় সদস্য দেশ—সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। বৈঠকে তারা সংহতি প্রকাশ করে এবং নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি ভূখণ্ড, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় ‘সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার’ অঙ্গীকার করে। তাদের ওই আলোচনায় আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এদিকে, আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ইরানকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘যুদ্ধ আপনাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে নয়। নিজেদের আশপাশে হামলা বন্ধ করুন। বিচ্ছিন্নতা ও উত্তেজনার পরিধি আরও বাড়ার আগেই বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিবেশীদের সঙ্গে আচরণ করুন।’