গ্রিনল্যান্ড দখলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে না থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিদলীয় মার্কিন কংগ্রেস প্রতিনিধি দল ডেনমার্কের রাজধানীতে যখন উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে, তার মধ্যেই এমন মন্তব্য করলেন ট্রাম্প।
গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলে আসছেন, ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত। চলতি সপ্তাহের শুরুতেও তিনি বলেছেন, আর্কটিক অঞ্চলের এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে না এলে তা ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প উদাহরণ দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন, এর আগে তিনি কীভাবে ইউরোপীয় মিত্রদের ওষুধ খাতে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও আমি তা করতে পারি। যদি দেশগুলো গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে একমত না হয়, তাহলে আমি তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারি। কারণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড আমাদের প্রয়োজন। তাই আমি তা করতেই পারি।’
এর আগে অবশ্য গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি করতে শুল্ক আরোপের কথা বলতে শোনা যায়নি তাকে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওই বৈঠকে গভীর মতপার্থক্যের নিরসন না হলেও একটি ‘কার্যকরী দল’ গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়, যার উদ্দেশ্য নিয়ে পরে ডেনমার্ক ও হোয়াইট হাউস ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রকাশ করে।
ইউরোপীয় নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই ভূখণ্ড নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডেরই। চলতি সপ্তাহে ডেনমার্ক জানিয়েছে, মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
যে সম্পর্ক ‘লালন করতে হবে’
কোপেনহেগেনে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ও প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের একটি দল শুক্রবার ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি দেশটির প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেনসহ শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রতিনিধি দলের নেতা ডেলাওয়ারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস স্বাগতিকদের বলেন, ‘২২৫ বছর ধরে একজন ভালো ও বিশ্বস্ত মিত্র এবং অংশীদার থাকার জন্য ধন্যবাদ।’ তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতেও কীভাবে এই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে আমাদের শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’
আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর লিসা মারকাউস্কি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, এই সফর বহু দশকের দৃঢ় সম্পর্কের প্রতিফলন এবং ‘এটি এমন একটি সম্পর্ক, যা আমাদের লালন করতে হবে।’
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডকে কোনো সম্পদ হিসেবে নয়, আমাদের একটি মিত্র হিসেবে দেখা দরকার। আমি মনে করি, এই প্রতিনিধিদলের কাছ থেকেও সেটিই শোনা যাচ্ছে।’
তবে এই সুর হোয়াইট হাউসের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের আহ্বানকে ন্যায্যতা দিতে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, দুর্লভ খনিজ সম্পদে ভরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে চীন ও রাশিয়ার নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। আবার হোয়াইট হাউস এই ভূখণ্ড বলপ্রয়োগে দখল করার সম্ভাবনাও নাকচ করেনি।
শুক্রবারের বৈঠকে অংশ নেওয়া গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিক ও ডেনিশ পার্লামেন্ট সদস্য ওহা খিমনিৎস বলেন, ‘সত্যি বলতে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর হুমকি নিয়ে আমরা অনেক মিথ্যা ও অতিরঞ্জন শুনেছি। আমার মতে, বর্তমানে যে হুমকিগুলো আমরা দেখছি, তার বেশিরভাগ যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেই আসছে।’
মারকাউস্কি ব্যয় ও ভোটারদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এটা জোর দিয়ে বলা জরুরি—যখন আমেরিকার জনগণকে জিজ্ঞেস করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখল করার ধারণাটি ভালো কি না, তখন বিপুল সংখ্যক, প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার বলেছে, আমরা মনে করি না যে এটি ভালো ধারণা।’
নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিনের সঙ্গে মারকাউস্কি একটি দ্বিদলীয় বিল উত্থাপন করেছেন, যাতে কোনো ন্যাটো সদস্যরাষ্ট্রের সম্মতি বা নর্থ আটলান্টিক কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া গ্রিনল্যান্ড কিংবা কোনো সার্বভৌম ন্যাটো ভূখণ্ড সংযুক্ত বা নিয়ন্ত্রণে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্র দপ্তরের তহবিল ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্যের সমালোচনায় ইনুইট কাউন্সিল
চলমান এই উত্তেজনা গ্রিনল্যান্ডবাসীদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন মঙ্গলবার বলেন, ‘যদি আমাদের এখানে ও এখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কাউকে বেছে নিতে হয়, সেক্ষেত্রে আমরা ডেনমার্ককে বেছে নিচ্ছি। আমরা ন্যাটোকে বেছে নিচ্ছি। আমরা ডেনমার্ক রাজতন্ত্রকে বেছে নিচ্ছি। আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বেছে নিচ্ছি।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলাস্কা, কানাডা, গ্রিনল্যান্ড ও রাশিয়ার চুকোটকা অঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ইনুইটের প্রতিনিধিত্ব করা নুকভিত্তিক সংস্থা ইনুইট সার্কামপোলার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বলেন, গ্রিনল্যান্ড অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে থাকতে হবে—হোয়াইট হাউসের এমন ধারাবাহিক বক্তব্য ‘গ্রিনল্যান্ডের মানুষের সম্পর্কে মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি তাদের দৃষ্টি এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।’
সারা ওলসভিগ নুকে অ্যাসোসিয়েট প্রেসকে বলেন, বিষয়টি হলো ‘বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি কীভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জনগোষ্ঠীগুলোর দিকে তাকায়। আর সেটি সত্যিই উদ্বেগজনক।’ গ্রিনল্যান্ডের আদিবাসী ইনুইটরা আবারও ঔপনিবেশিক শাসন চান না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।