তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ও পুরনো বিদ্যুৎ অবকাঠামোর কারণে কিউবাজুড়ে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। দেশটির প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ, দুর্বল বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৬ মার্চ) থেকে পুরো কিউবাজুড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই দেশটির পুরনো বিদ্যুৎ গ্রিডও ভেঙে পড়ছে।
কিউবার জ্বালানি ও খনি মন্ত্রণালয় এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে জানায়, দেশটির বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যেসব ইউনিটগুলো সচল ছিল, সেগুলোতে কোনো ত্রুটি ছিল না, তারপরও কেন এমন বিপর্যয় হলো তার তদন্ত করা হচ্ছে।
দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের পরিচালক লাসারো গেরা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করার জন্য তাদের কর্মীরা কয়েকটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করার কাজটি ধীরে ধীরে করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যা না হয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থায় থাকা সিস্টেমগুলো অল্প সমস্যাতেই আবার বিকল হয়ে যেতে পারে।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাভানার কিছু বাড়িতে মোমবাতি জলতে দেখা যায়। একটি অন্ধকার বাড়িতে শিশুদের খেলাধুলা ও মায়ের সঙ্গে গান গাওয়ার শব্দ শোনা যায়।
হাভানার বাসিন্দা ইউনিসি সেসিলিয়া রিভিয়ক্স একটি খোলা দরজার দিকে ইশারা করে বলেন, ‘আমাদের এখানে মেয়েদের জন্য একটি বিছানা পেতে রাখতে হবে যাতে তারা এখানে ঘুমাতে পারে। এছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আমার কাছে কোনো রিচার্জেবল ফ্যান বা জেনারেটরও নেই।’
গত চার মাসের মধ্যে এটি কিউবায় তৃতীয় বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়।
হাভানার ৬১ বছর বয়সী বাসিন্দা তমাস দাভিদ ভেলাসকেস ফেলিপ বলেন, ‘বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তার মনে হয়, যাদের সামর্থ্য আছে তাদের কিউবা ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। তিনি বলেন, আমাদের খাবার নষ্ট হয়ে যায়। আমার মতো বয়স্ক মানুষদের এভাবে কষ্ট সহ্য করা কঠিন।’
তবে সোমবার রাতে কিউবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হাভানার প্রায় ৫ শতাংশ বাসিন্দার বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, সংখ্যায় যা প্রায় ৪২ হাজার গ্রাহকের মতো। দ্বীপজুড়ে কয়েকটি হাসপাতালেও বিদ্যুৎ ফিরেছে।
দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এখন থেকে দেশটির যোগাযোগ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হবে। তবে যেসব ছোট ছোট সার্কিটে আপাতত বিদ্যুৎ ফিরেছে সেগুলো আবারও বিকল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিউবার পুরোনো বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোর অবনতি হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিনই বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে এবং দেশজুড়ে বড় বড় ব্ল্যাকআউট হচ্ছে।
কিউবার সরকার এ পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবরোধকে দায়ী করেছে। কারণ জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, কিউবাকে তেল বিক্রি বা সরবরাহ করে এমন যেকোনো দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, কিউবা যদি রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেয় এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যেতে পারে। ট্রাম্প কিউবার ওপর বন্ধুত্বপূর্ণ দখল নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৬ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে কিউবা দখল করার সম্মান তারই হবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কিউবাকে মুক্ত করব নাকি দখল করব? আমি মনে করি আমি যা চাই তা-ই করতে পারি।’ এসময় তিনি কিউবাকে একটি খুব দুর্বল জাতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এবং ওয়াশিংটন ও হাভানার আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেলকে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপরাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিউবা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সংবেদনশীল আলোচনার বিষয় হওয়ায় তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানান। তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কাকে কিউবার ক্ষমতায় দেখতে চায়, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত জানাননি তারা।
কয়েকদিন আগে দিয়াস-কানেল প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, তার সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এর আগে, সোমবার নিউ ইয়র্ক টাইমস এই আলোচনার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে।