তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলু ও তার ৪০২ জন সহযোগী বড় ধরনের দুর্নীতি মামলার বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরোধী এই নেতার বিরুদ্ধে ১৪২টি অভিযোগ আনা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে বিরোদী দলকে দমনের রাজনৈতিক চেষ্টা বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
স্থানীয় সময় সোমবার (৯ মার্চ) দেশটির আদালতে এই বিচারকার্য অনুষ্ঠিত হয়।
ইমামোগলু প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ২৩ বছরের শাসনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। গত বছরের মার্চে তাকে আটক করার পরও কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের জন্য প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) তাকে তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে।
দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত ৪০২ জন আসামির অধিকাংশই ইস্তাম্বুল মেট্রোপলিটন মিউনিসিপ্যালিটির কর্মী। ২০১৯ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইমামোগলু। এই আসামিদের মধ্যে অনেকেই সিএইচপির কর্মকর্তা। এছাড়া তাদের মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিকও রয়েছেন।
গত বছরের ১৯ মার্চ ইমামোগলুকে গ্রেপ্তার করার পর তুরস্কে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে সড়ক বিক্ষোভ শুরু হয়। গত দশ বছরের মধ্যে এটিই ছিল দেশটিতে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ আন্দোলন।
ইমামোগলুর বিরুদ্ধে মোট ১৪২টি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি হলো ২০১৫ সাল থেকে ‘ইমামোগলু ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন ফর প্রফিট’ নামে একটি সংগঠন গঠন করার অভিযোগ। ওই সময় তিনি ইস্তাম্বুলের বেইলিকদুজু জেলার মেয়র ছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের করা ৩ হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা শুধুমাত্র দরপত্র কারসাজি ও ঘুষের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। পাশাপাশি তারা সিএইচপির ভেতরে ইমামোগলুর রাজনৈতিক উত্থানকে অর্থায়ন করেছে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার পথে নিয়ে গিয়েছে।
যদি এসব অপরাধে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তার ২ হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ড হতে পারে।
শুক্রবার একটি পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে ইমামোগলু বলেন, সোমবারের এই বিচার তুরস্কের ইতিহাসে গণতন্ত্র রক্ষায় সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। এটি জনগণের ইচ্ছাকে অবদমিত করার একটি প্রচেষ্টা।’
ইমামোগলুর বিরুদ্ধে বহু অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ইমামোগলু ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন ফর প্রফিট’ নামের ওই সংগঠনের মামলা। এসব মামলায় তিনি কারাদণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধও হতে পারেন। অন্যান্য অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ, গুপ্তচরবৃত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার জাল ডিপ্লোমা ডিগ্রি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের অপমান করার অভিযোগ।
তবে সরকারের সমালোচকদের মতে, বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে বিচারিক অভিযান চালাচ্ছে সরকার। এতে সিএইচপির নির্বাচিত প্রার্থীরা, বিশেষ করে অন্যান্য বড় শহরের মেয়ররা সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েছেন।
২০২৩ সালে কংগ্রেসে নিয়মভঙ্গের অভিযোগে সিএইচপির শীর্ষ নেতৃত্বও আইনি চাপের মধ্যে রয়েছে।
ইস্তাম্বুল মেট্রোপলিটন মিউনিসিপ্যালিটির বিরুদ্ধে হওয়া এই মামলার পরিসর এবং এর দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ নতুন একটি আদালত ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আদালত ভবনটি ইস্তাম্বুলের পশ্চিমে সিলিভ্রি কারাগার কমপ্লেক্সে নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে ইমামোগলুসহ অনেক আসামি বন্দি রয়েছেন।
নতুন আদালত ভবনটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মামলায় সংশ্লিষ্টদের কারাগারে বিদ্যমান একটি আদালতকক্ষে গাদাগাদি করে শুনানিতে অংশ নিতে হবে।
সিএইচপি সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এটি তুলে ধরতে ইমামোগলুর সমর্থক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ইস্তাম্বুলের চিফ প্রসিকিউটরের ভূমিকা।
ইমামোগলুর সমর্থকদের মতে, আকিন গুরলেক ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইস্তাম্বুলের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান। তার আগে তিনি উপবিচারমন্ত্রী ছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি সিএইচপি নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত শুরু করেন। পরে গত মাসে তিনি আবার সরকারে ফিরে গিয়ে বিচারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
সমালোচকরা আরও বলছেন, রাষ্ট্রপক্ষ থেকে গোপন সাক্ষী ব্যবহার করা হচ্ছে, যাদের পরিচয় প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের কাছেও গোপন রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আসামিদের দিয়ে সহ-আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ানো হচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের অধিকার লঙ্ঘন করে বলে দাবি করছেন তারা।
তবে দেশটির সরকার বলছে, তুরস্কের বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক বেঞ্জামিন ওয়ার্ড বলেন, ‘গত এক বছরে সিএইচপির বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলোকে আমরা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে দেখছি।’
তিনি বলেন, ‘এই মামলাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরকার ইমামোগলুকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। এজন্য রাষ্ট্রপক্ষ তার দলের দুর্নাম করার চেষ্টা করছে। এর ফলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’