সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলি বাহিনী ও রুশ বাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের যৌন সহিংসতা-বিষয়ক ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন নির্যানের অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং ইউক্রেনের যুদ্ধবন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে দুই দেশই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা নিয়ে তৈরি জাতিসংঘের ৩৫ পৃষ্ঠার বার্ষিক এ প্রতিবেদনটি স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৯ মে) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এর আগেই বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘে ইসরায়েলের মিশন প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যৌন সহিংসতার অভিযোগে জড়িত ১২টি দেশের ৭৭টি সরকারি ও বেসরকারি পক্ষকে কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৫ সালের এই তালিকায় রয়েছে ইসরায়েলের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর নাম। একইসঙ্গে এই তালিকায় হামাসের নামও রয়েছে । ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর হামাস আগে থেকেই কালো তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া, ইউক্রেন যুদ্ধে যুদ্ধবন্দি ও আটক বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগে এ বছর রাশিয়ার সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীকেও এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
এর আগে, গত বছরের প্রতিবেদনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইসরায়েল ও রাশিয়াকে সতর্ক করেছিলেন, তাদের নামও এই তালিকায় যুক্ত হতে পারে।
তালিকায় নাম আসার পর ইসরায়েল ও রাশিয়া—দুই দেশের রাষ্ট্রদূতই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা এ ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সমালোচনা করেছেন।
জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, ‘আমরা মহাসচিবকে চিঠি দেব। চিঠিতে জানানো হবে, প্রতিবেদনে আনা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। আগের মতোই আবারও রাশিয়াকে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।’
তিনি জানান, ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করছে, সেসব তথ্য সংগ্রহ করে রাশিয়াও একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘ মহাসচিবের কর্মকাণ্ডে হতাশ। গুতেরেস ইসরায়েলকে হামাস, আইএস এবং বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে একই কালো তালিকায় রেখেছেন।’
ড্যানন আরও জানান, প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর জবাবে ইসরায়েল আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা জাতিসংঘের কাছে জমা দিয়েছিল।
উল্লেখ্য, আগামী ৩১ ডিসেম্বর মাসে গুতেরেসের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হবে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার একটি ধারাবাহিক চিত্র নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ। বিশেষ করে ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আটক ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে এ ধরনের একাধিক ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটি গাজা ও পশ্চিম তীরের ১৪ জন পুরুষ, ৭ জন নারী, ৯ জন ছেলে ও এক মেয়ে শিশুর ওপর সংঘাতকালে যৌন সহিংসতার একাধিক ঘটনা যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালে। বাকি ১৮টি ঘটনা ঘটে ২০২৩ ও ২০২৪ সাল মিলিয়ে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ আরও করা হয়েছে, এসব নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌনাঙ্গে শারীরিক নির্যাতন, যৌনাঙ্গ লক্ষ্য করে গুলি, স্তন ও যৌনাঙ্গ স্পর্শ, অযৌক্তিকভাবে পোশাক খুলে শরীর তল্লাশি এবং ধর্ষণের হুমকির মতো ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে অন্তত ৯ জন ভুক্তভোগীর ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই গাজার বাসিন্দা। তাদের কেউ কেউ একাধিকবার ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ), ইসরায়েলের কারা বিভাগ, বিশেষ বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা জড়িত ছিলেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ওঠা সকল অভিযোগ তারা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, অভিযোগগুলো তারা পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনা করেছে। সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লিখেছে, এই সিদ্ধান্ত আবারও প্রমাণ করল, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্ব রয়েছে।
এদিকে, প্রতিবেদনে হামাসের বিরুদ্ধে আবারও যৌন সহিংসতার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে জাতিসংঘ জানিয়েছে, অভিযোগের অনেক তথ্য এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ তদন্ত পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার জাতিসংঘকে এখনও দিচ্ছে না ইসরায়েল সরকার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়াও নিয়মিতভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তকারীদের প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। এরপরও রাশিয়া এবং রুশ-নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধবন্দি ও আটক বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ৩১০টি ঘটনা যাচাই করতে পেরেছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে ইউক্রেনের ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা যুদ্ধবন্দি ও আটক বেসামরিকদের বিরুদ্ধে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। এসব ঘটনার বেশিরভাগই ২০২৫ সালের আগের সময়ের। তবে ইউক্রেনকে জাতিসংঘের কালো তালিকায় রাখা হয়নি।