নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিয়া হোসেন অদিতা (১৪) হত্যা মামলায় আসামি কোচিং শিক্ষক আব্দুর রহিম রনিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই অদিতাকে হত্যা করা হয় বলে আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ খোরশেদুল আলম সিকদার এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. সেলিম শাহী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকায় নিজ বাসা থেকে স্কুলছাত্রী অদিতার গলা ও হাত-পায়ের রগ কাটা অবস্থায় রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ঘটনার দিন রাতেই অদিতার সাবেক কোচিং শিক্ষক স্থানীয় আব্দুর রহিম রনিকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন রনি।
গ্রেপ্তারের সময় রনির মাথা, ঘাড়, গলাসহ শরীরের একাধিক স্থানে অদিতার নখের আঁচড় দেখতে পায় পুলিশ। এমনকি তার পরিহিত জামায়ও রক্তের দাগও পাওয়া যায়। পরে রনির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যায় ব্যবহৃত ছোরা, বালিশসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করে পুলিশ।
চাঞ্চল্যকর এ মামলায় বাদীপক্ষের ৪১ জন সাক্ষী গ্রহণ করা হয়। আসামিপক্ষের পাঁচজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্যও গ্রহণ করেন বিচারক।
হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে আসামির ফাঁসির দাবি জানায়। একইসঙ্গে স্থানীয় সচেতন মহল এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তোলে।
তাসনিয়া হোসেন অদিতা নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার প্রয়াত রিয়াজ হোসেন সরকারের মেয়ে ছিল। তার মা রাজিয়া সুলতানা বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। রিয়াজ হোসেন সরকার ২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় মারা যান। এরপর রাজিয়া সুলতানা দুই মেয়েকে নিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণপুরের জাহান মঞ্জিলে থাকতেন।
ঘটনার দিন সকালে বাসা থেকে স্কুলে যায় অদিতা। দুপুর ১২টার দিকে প্রাইভেট পড়া শেষে সে বাসায় একা ছিল। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ঘরের মূল দরজায় তালা দেখতে পান তার মা। তালা খুলে ভেতরে ঢুকে সামনের কক্ষে আলমারির জিনিসপত্র এলোমেলো দেখতে পান তিনি। সে সময় তিনি ঘরে অদিতাকে দেখতে পাননি। কিছুক্ষণ পর অন্য একটি কক্ষ খুলে মেয়ের বিছানায় তার গলা ও দুই হাতের রগ কাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি।
রাজিয়া সুলতানা জানান, ঘটনার কিছুদিন আগে রনির কোচিংয়ে পড়া বন্ধ করে দিয়ে অন্য জায়গায় প্রাইভেট পড়তে শুরু করে অদিতা। এতে ক্ষিপ্ত হন রনি। যদিও বিষয়টি তাদের বুঝতে না দিয়ে অদিতাদের বাসায় বিভিন্ন সময় আসা-যাওয়া করতেন তিনি।
ঘটনার দিন অদিতার মা বাসায় না থাকার সুযোগে দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যে অদিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন রনি। পরে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য ঘরে আলমারিতে থাকা মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখেন তিনি।
ঘটনার পর পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে আব্দুর রহিম রনিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তদন্ত শেষে অন্যদের অব্যাহতি দিয়ে রনিকে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।
রায় ঘোষণার পর নিহতের মা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মামলায় সহযোগিতাকারী আইনজীবী, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একইসঙ্গে তিনি দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান।
বাদীপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট মোল্লা হাবিবুর রসুল মামুন। তিনি বলেন, এ রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির হিরু। তিনি রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান, আসামিপক্ষ ন্যায়বিচার পাননি। তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।