কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কবর খুঁড়ে আলোচিত পীর হিসেবে পরিচিত আব্দুর রহমান ওরফে শামিমের দেহাবশেষ তুলে তার প্রতিষ্ঠিত দরবার শরিফে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শনিবার বিকেলে দরবার শরিফ থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষ আগের কবরস্থানেই পুনরায় দাফন করা হয়েছে।
নিহতের ভাই ফজলুর রহমান বাদী হয়ে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে দৌলতপুর থানায় মামলাটি করেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। দেহাবশেষ সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে।
এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাতের কোনো একসময় উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকার দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থান থেকে শামিমের দেহাবশেষ তুলে তার প্রতিষ্ঠিত ‘শামিমি বাবার দরবার শরিফে’ নিয়ে দাফন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। শনিবার সকালে বিষয়টি জানতে পারেন তার স্বজনেরা। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে কবরটি খোঁড়া অবস্থায় দেখতে পান।
পরে প্রশাসনের নির্দেশে দরবার শরিফ প্রাঙ্গণে খোঁড়া নতুন কবর থেকে শামিমের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। শনিবার বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার ‘৫০০ বিঘা মাঠ’ নামে পরিচিত কবরস্থানে তার দেহাবশেষ পুনরায় দাফন করা হয়।
দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, পুরোনো কবর খুঁড়ে দেখা যায় সেখানে শামিমের দেহাবশেষ নেই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দরবারে থাকা দেহাবশেষ উদ্ধার করে মূল কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কবর থেকে দেহাবশেষ সরিয়ে নেওয়ার আলামত পায়। পরে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নির্দেশে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় দরবার প্রাঙ্গণ থেকে দেহাবশেষ উত্তোলন করে আগের কবরস্থানেই পুনরায় দাফন করা হয়।
তিনি বলেন, রাতের আঁধারে কারা কবর খুঁড়ে দেহাবশেষ সরিয়ে নিয়েছে, তা শনাক্তে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই ফজলুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ভেড়ামারা-দৌলতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, দেহাবশেষ পুনরায় দাফনের পর অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কবরস্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, কারা কবর খুঁড়ে দেহাবশেষ সরিয়ে নিয়েছিল, তা তদন্ত করে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কবরটি পাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক-দুই দিনের মধ্যে পরিবার এ কাজ বাস্তবায়ন করবে।
জানা গেছে, জীবিতাবস্থায় শামিম তার প্রতিষ্ঠিত দরবার শরিফ প্রাঙ্গণেই সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। মৃত্যুর পর তার অনুসারীদের একটি অংশও দরবার প্রাঙ্গণে তাকে দাফনের দাবি জানায়। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এর আগে, চলতি বছরের ১১ এপ্রিল দুপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামিমের দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় তাকে মারধর করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরদিন ১২ এপ্রিল ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকার একটি ঈদগাহে জানাজা শেষে দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শামিম হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই বাদী হয়ে ১৩ এপ্রিল রাতে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারভুক্ত চার আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। তারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
হত্যার প্রায় পাঁচ মাস পর কবর খুঁড়ে শামিমের দেহাবশেষ তুলে দরবার শরিফে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দেহাবশেষ আগের কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হলেও কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।