সিলেটে ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত ৯ জনের পরিচয় মিলেছে। এ দুর্ঘটনায় আহত ২৪ জনের ১৪ জন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন—কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে হাজি সাইফুল ইসলাম (৫০), সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুল এলাকার জাহাঙ্গীরের চার বছর বয়সী মেয়ে শিশু ফাইজা আক্তার, সিলেট নগরের সোবহানীঘাট এলাকার বাসিন্দা উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চণ্ডিবের গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী (২৬), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৪), সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার উমনপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান (১৯), কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার শেরপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ইমন (৪৫), এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার ষাইধার (আটরামপুর) গ্রামের রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে রুবেল সূত্রধর (৩৭)।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় দুই বাসের অন্তত ২৪ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪ জন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তারা হলেন—ওয়াহাব (৪৫), ঢাকার মনসুর আলী (৩৪), ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার আতিকুল ইসলাম (৪৮), কিশোরগঞ্জের বাবুল (৪০), ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার মফিজ মিয়া (৫৫), সাজিদ নুর (৪৫), নুরুন্নাহার (৪০), মুক্তার হোসেন (২৯), জাহাঙ্গীর (২৮), আফজল (৩০), আফরোজা (৩৮), মন্টু (৩০), সুমানগঞ্জের রাজু দাস (৩৫)। এক জনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
আহত অন্যরা হলেন—কিশোরগঞ্জের ফারুক আহমদ (৫০), ফরিদপুরের শামীম আহমদ (৫০), ঢাকার মঞ্জু দাস (৫০), কুমিল্লার ইমরান (৩৫) গুরুতর আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
গতকাল (শুক্রবার) সকাল ৭টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর কাশিকাপন নামক এলাকায় ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের বাসের সঙ্গে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীতগামী ইউনিক পরিবহন বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের ডান দিক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাসটি রাস্তার পাশে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ওসমানীনগর থানা, শেরপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ ও ওসমানীগর ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌছে হতাহতদের উদ্ধার করে এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। নিহতের মরদেহ শেরপুর হাইওয়ে থানা পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। এ সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হলে পুলিশ আধঘণ্টা চেষ্টা করে যানচলাচল স্বাভাবিক করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার কোচ ওভারটেক করতে গিয়ে ঢাকাগামী ইউনিক বাসকে আঘাত করে। ঘটনার পর স্বজনহারাদের ভিড় নামে শেরপুর হাইওয়ে থানা ও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে নিহত ও আহতদের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নিহতদের স্বজনদের খুঁজছে শেরপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে মোট ১৬ জন আহতকে আনা হয়। এর মধ্যে চার বছরের শিশু জাইফাকে মৃত অবস্থায় আনা হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রীতম নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে ১৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মবিন বলেন, আহতদের সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। ক্যাজুয়ালটি বিভাগে থাকা পাঁচজনের অবস্থা শঙ্কামুক্ত এবং শিগগিরই তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হবে। ইএনটি বিভাগে ভর্তি দুইজনের অবস্থাও স্থিতিশীল বলে জানান তিনি।
চক্ষু বিভাগে পাঁচজনের মধ্যে চারজনের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে এবং একজনের চোখে গুরুতর আঘাত থাকায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। নিউরো সার্জারিতে ভর্তি তিনজনের মধ্যে দুজনের অবস্থা ভালো হলেও আফতাব নামে একজনের মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মবিন।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর থানার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের আব্দুল আলিমের ছেলে আব্দুর রহমান বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি বেঁচে যাই। ঘটনার কথা মনে হলে শরীর কেঁপে উঠে। মুহুর্তের মধ্যে ইউনিক গাড়িকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলে তরতাজা প্রাণগুলো ঝরে যায়।’
ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মোস্তফা বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা থানা পুলিশ এবং ওসমানীনগর ফায়ার সার্ভিস মিলে হতাহতদের উদ্ধার করি। নিহতদের মরদেহ শেরপুর হাইওয়ে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ চলছে।
ওসমানীনগর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (তাজপুর) স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা অপু মিয়া জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে এবং আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশ সিলেট অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিজ লেনেই চলছিল। এ সময় ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে বিপরীত পাশে চলে আসে এবং ইউনিক পরিবহনের বাসটিকে ধাক্কা দিলে দুর্ঘটনাটি ঘটে।