কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তার জন্য জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে (ডব্লিউএফপি) ৪০০ টন চাল দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এর অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে আজ ১৩৯ টন চাল আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
শুক্রবার (১০ জুলাই) উখিয়ায় ডব্লিউএফপির লজিস্টিকস হাবে চাল হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান ও বাংলাদেশে ডব্লিউএফপির কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা। এছাড়া শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবির ও ভাসানচরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম ধাপের এই চাল সহায়তার মাধ্যমে ডব্লিউএফপি এক মাসের জন্য প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গার খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে পারবে।
ঘনবসতিপূর্ণ ও পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা শিবিরগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি টানা বর্ষণ ও বন্যায় শিবিরের বিভিন্ন এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চলাচল ও জরুরি সেবায় বিঘ্ন ঘটেছে এবং কয়েকজনের প্রাণহানিও ঘটেছে। আয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ রোহিঙ্গা এখনো মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণে মানবিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
অনুষ্ঠানে সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, ‘বাংলাদেশ বহু বছর ধরে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই চাল সহায়তা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে আমাদের অব্যাহত অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। একইসঙ্গে আমরা এই সংকটের একটি টেকসই সমাধানের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে। এই সংকটে ডব্লিউএফপির কার্যকর ও ফলপ্রসূ খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমও প্রশংসার দাবিদার।
এই চাল ডব্লিউএফপির চলমান খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে ডব্লিউএফপি নিয়মিত এ কর্মসূচি পর্যালোচনা করে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সংস্থাটি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন মাত্রার খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি খাদ্য সংকটে থাকা পরিবারগুলো সর্বোচ্চ সহায়তা পাচ্ছে এবং সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে ডব্লিউএফপির কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা বলেন, ‘এই সময়োপযোগী সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতি ডব্লিউএফপি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানায়। বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন যখন তীব্র চাপে রয়েছে, তখন এই উদ্যোগ রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের অব্যাহত নেতৃত্ব, মানবিকতা ও সংহতিরই প্রমাণ।’
খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি ডব্লিউএফপি নারী ও শিশুদের অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, লার্নিং সেন্টারে পড়ুয়া শিশুদের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩৩ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র কৃষককে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি ও বাজার সংযোগে সহায়তা দিচ্ছে, যাতে তারা স্থানীয় বাজার এবং ডব্লিউএফপির খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করতে পারেন।
আগামী ১২ মাসে এসব কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ডব্লিউএফপির জরুরি ভিত্তিতে ১১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন।
কোকো উশিয়ামা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তা এখনো জীবনরক্ষাকারী সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর পাশে থাকতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই।’