নদীতে কেউ নিখোঁজ হয়েছেন। ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছেছে ফায়ার সার্ভিসের দল। কিন্তু শুরু করা যাচ্ছে না উদ্ধার অভিযান। কারণ, কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসে নেই প্রশিক্ষিত ডুবুরি। প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরত্বের খুলনা থেকে ডুবুরি দল আসার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যাতে সময় লেগে যায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা।
নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ায় এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা, কুমার ও সাগরখালীসহ জেলার ওপর দিয়ে ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত আটটি নদ-নদী বয়ে গেছে। এসব নদীর সঙ্গে জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাচল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ নদীতে দুর্ঘটনা বা কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধারের জন্য কুষ্টিয়াকে নির্ভর করতে হয় খুলনার ওপর।
এর ফলে দুর্ঘটনার পরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ঘণ্টা কেটে যায় শুধু ডুবুরি দলের অপেক্ষায়। এতে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা যেমন কমে, তেমনি মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কোনো কোনো ঘটনায় স্বজনদের এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও সেই চিত্রই সামনে এনেছে। শুধু আগস্ট মাসেই কুষ্টিয়ার বিভিন্ন নদীতে ডুবে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার ভাগজোত ঘাটে পদ্মা নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১২ বছরের মাদ্রাসাছাত্র মোস্তাকিম হোসেন। স্থানীয়রা আরেক শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করলেও মোস্তাকিমকে সেদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ায় নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় ব্যাহত হয় উদ্ধার অভিযান। পরে খুলনা থেকে ডুবুরি দল পৌঁছালে পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনার আগে ৫ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড় ধসে নদীতে পড়ে যায় পাঁচ বছরের নূরী খাতুন ও আট বছরের জামিলা খাতুন। স্থানীয়রা জামিলাকে জীবিত উদ্ধার করলেও নূরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় পরদিন মিরপুর উপজেলার পদ্মা নদী থেকে।
১৪ আগস্ট কুমারখালীর শিলাইদহ পদ্মা নদীর ঘাটে নিখোঁজ হয় আট বছরের শিশু আলিফ হোসেন। একই দিন সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আর ২৪ আগস্ট কুমারখালী পৌরসভার এম এন বাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে গড়াই নদীতে ডুবে মারা যান জেলে পরিমল মণ্ডল (৩৮)।
শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, এসব ঘটনায় উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছালেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে পানির নিচে উদ্ধার অভিযান চালাতে পারেন না। স্থানীয়রা নৌকা, জাল কিংবা দেশীয় উপকরণ নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব ব্যবস্থা প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জামের বিকল্প নয়।
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেনের বক্তব্যে সমস্যাটির প্রশাসনিক দিকটিও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, কুষ্টিয়া নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে নৌ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। জেলা পর্যায়ে আলাদা ডুবুরি দল না থাকায় বিভাগীয় শহর খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। খবর পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে খুলনা থেকে ডুবুরি দলকে কুষ্টিয়ায় পৌঁছাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
ওয়াদুদ হোসেন বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে খুলনার ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে জনগণের তোপের মুখে পড়তে হয়। জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, সমস্যাটি যে নতুন নয়, তা ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব বক্তব্যেই স্পষ্ট। ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথ, নিয়মিত দুর্ঘটনা এবং দীর্ঘদিনের দাবির পরও কুষ্টিয়ায় কেন স্থায়ী ডুবুরি দল গঠন হয়নি—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সামাজিক সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাহাব উদ্দীন মিলন বলেন, ‘যে জেলায় পদ্মা ও গড়াইয়ের মতো প্রমত্তা নদী রয়েছে, সেখানে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা হতাশাজনক। অবিলম্বে কুষ্টিয়া জেলায় স্থায়ী ডুবুরি দল নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ফায়ার স্টেশনে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দরকার।’
পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনেরা একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে কখন উদ্ধারকারী দল আসবে, সেই অপেক্ষাও করতে হয়। স্থানীয়রা নৌকা, জাল ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জামের বিকল্প তারা হতে পারেন না।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোমিন ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সুযোগ থাকে। কিন্তু দূরের জেলা থেকে ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সেই সম্ভাবনা অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।’
মোস্তাকিমের মা শিউলি খাতুনের আহাজারিতেও সেই অপেক্ষার অসহায়তা ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমার ছাওয়াল ছুটির দিন বন্ধুগোরে সাথে নদীর পাড়ে খেলতে যায়ে ডুবে গেল। এখনও ছাওয়ালটার খোঁজ পালাম না। খুলনা থেকে লোক আসপে, তারপরে উদ্ধার হবে—এই অপেক্ষা করতি হচ্ছে।’
কুষ্টিয়ার মতো নদীবেষ্টিত একটি জেলায় দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানের প্রথম কয়েক ঘণ্টাই যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে দেড়শ কিলোমিটার দূর থেকে ডুবুরি দলের আসার ওপর নির্ভরতা কতটা কার্যকর—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। আর ততদিন নদীতে নিখোঁজ হওয়ার প্রতিটি ঘটনায় স্বজনদের অপেক্ষার সময়টিই হয়ে থাকছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।