তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে মাত্র দুই দিনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অন্তত ২৫০টি ঘরবাড়ি ও জমিজমা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে কাপাসিয়া, ভোরের পাখি ও লালচামার এলাকার বহু পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে রাত-দিন কাটাচ্ছে। ঘরে খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই—নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো এসব মানুষের জীবন এখন মানবেতর।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই ঘরের চাল বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাননি। সর্বস্ব হারিয়ে কেউ নদীর পাড়ে, কেউ খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে তাদের দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়।
খাবারের সংকট দেখা দেওয়ায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নদীভাঙনে বাস্তুহারা মানুষের জন্য প্রতিদিন খিচুড়ি সরবরাহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্তদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভাঙনের খবর পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির মাজেদুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল বিতরণ করেছেন।
এদিকে, নদীভাঙনে শুধু বসতভিটাই নয়, হারিয়ে যাচ্ছে চরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে চলতি বছরে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের অন্তত আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও ছয়টি বিদ্যালয় রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে।
চরাঞ্চলের বালুচরে একসময় যেখানে ছিল বিদ্যালয় ভবন, শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ-টেবিল আর শিক্ষার্থীদের কোলাহল, এখন সেখানে শুধু নদীর পানি। ইতোমধ্যে ফুলছড়ি উপজেলার আঙ্গারীদহ, উত্তর খাটিয়ামারি, চর চৌমোহন, সদর উপজেলার সীতাসতী এবং সুন্দরগঞ্জের ভোরের পাখিসহ আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনে সম্পূর্ণ বিলীন হয়েছে।
ভবন হারানো আটটি বিদ্যালয়ের কোথাও খোলা আকাশের নিচে, আবার কোথাও টিনের ছাপড়া তুলে চলছে পাঠদান। রোদবৃষ্টি ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসছে না। কোথাও একটি ছাপড়ার নিচে দুই শ্রেণির মাত্র চারজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে চলছে পাঠদান। এতে দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের স্কুল গেল, আশপাশের গ্রামও নদীতে চলে গেছে। আমাদের স্কুলের শিশুরা কে কোথায় চলে গেছে বলতে পারছি না। তবে এখনও চার টিনের ছাপড়ার নিচে দুই শ্রেণির চারজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ক্লাস চলছে।’
নদীর ভয়াবহ ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড গতকাল থেকে জিও ব্যাগ ফেলছে। তবে এ উদ্যোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সাবেক ইউপি সদস্য রাজা মিয়া বলেন, ‘নদীতে সব চলে গেল, এখন বস্তা ফেলে রক্ষার কাজ শুরু করলেন।’
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা চরবান্ধব ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যালয়ের জন্য নিরাপদ জায়গা নির্ধারণের দাবি জানান।
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ কুমার দাশ বলেন, চলতি বছরের বন্যায় চরাঞ্চলের আটটি স্কুল নদীগর্ভে চলে গেছে। আরও ছয়টি বিদ্যালয় ঝুঁকিতে রয়েছে।