মাত্র এক দিনের ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে সুর পাল্টেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি জানালেন, দেশটির নেতৃত্ব একটি ‘কার্যকর’ পরিকল্পনা পেশ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছেন ট্রাম্প, যা প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধ অবসানের পথ প্রশস্ত করবে বলে তিনি আশা করছেন।
পাকিস্তানের নেতৃত্বে মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাপক তৎপরতার ফলে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও পর্দার আড়ালে থেকে এই যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে ভূমিকা রেখেছে ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীন।
তেহরানের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার দেড় ঘণ্টা আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এর আগে তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির কারণ হলো আমরা ইতিমধ্যে আমাদের সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি; এমনকি তা ছাড়িয়ে গেছি। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি।’
বুধবার হোয়াইট হাউসে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক করার কথা রয়েছে। সেখানে এই যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হুমকের সময়সীমা শেষ হয়ে আসার আগে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পের ‘একটি পুরো সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করার’ হুমকিকে ‘নৈতিক পরাজয়’ বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, পোপ চতুর্দশ লিও সতর্ক করে বলেছেন, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পিছু হটার পেছনে একটি সহজ সত্য কাজ করে থাকতে পারে। সংঘাত বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়তে পারত যা আগের প্রেসিডেন্টদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল। অথচ নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি এমন সব যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখবেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ছিল দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া
গত ছয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সাফল্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকলেও ট্রাম্প মনে করেছিলেন, বোমা হামলার মাধ্যমে ইরানকে নত করা সম্ভব। যুদ্ধের শুরুতেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পরও ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে—এই সম্ভাবনাকে তিনি অবমূল্যায়ন করেছিলেন বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
তবে গত ৪৭ বছরে ইসলামিক রিপাবলিক ইরান বারবার দেখিয়েছে যে তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অনড় থাকতে পারে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ৪৪৪ দিন মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করে রাখা কিংবা বছরের পর বছর ধ্বংসাত্মক ইরান-ইরাক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এর প্রমাণ। এমনকি গাজা ও লেবাননে মিত্রশক্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পরও তেহরান তাদের অবস্থানে অনড় ছিল।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্রুত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল।
অলাভজনক সংস্থা ‘ব্যাটল রিসার্চ গ্রুপ’-এর নির্বাহী পরিচালক বেন কনেবল বলেন, ইরান যাতে জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে না পারে, সেজন্য প্রায় ৬০০ কিলোমিটার ইরানি ভূখণ্ড দখলে রাখতে হতো। এর জন্য কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন সৈন্যের প্রয়োজন পড়ত যা মোটামুটি ২০ বছর মেয়াদি একটি অভিযানে পরিণত হতে পারত।
মার্কিন নৌবাহিনীর এই অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এটি একটি অনির্দিষ্টকালের অভিযানে পরিণত হতে পারতো। সহজ কথায় বলতে গেলে, ২০ বছরের জন্য প্রস্তুত থাকা। আমরা কখনোই ভাবিনি যে আমাদের আফগানিস্তানে ২০ বছর থাকতে হবে। এমনকি ভিয়েতনাম বা ইরাকে আমাদের যতটা সময় থাকতে হয়েছে, সেটাও ছিল ধারণার বাইরে।’
আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার আওতায় ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায় করতে পারবে। ইরান এই অর্থ দেশ পুনর্গঠনের কাজে ব্যয় করবে। তবে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে পরিচিত এই পথে এর আগে কখনও মাশুল দিতে হয়নি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্প কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তেহরানের হাতে তুলে দিচ্ছেন যা ইরানের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক বিজয়’।
চরম অবস্থান থেকে ট্রাম্পের পিছু হটার পুরনো প্রবণতা
ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা আরও দুই সপ্তাহ বাড়াতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অনুরোধ জানানোর পর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। একইসঙ্গে তিনি ইরানকেও দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বড় কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘দুই সপ্তাহ’ সময় নেওয়া ট্রাম্পের একটি সুপরিচিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। গত গ্রীষ্মে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল যে ইরানের ওপর প্রাথমিক বোমা হামলা চালানোর বিষয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন ট্রাম্প। কিন্তু সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই তিনি বিমান হামলার নির্দেশ দেন এবং দাবি করেন, এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘বিধ্বস্ত’ হয়েছে।
এর আগে, ইউক্রেন যুদ্ধ বা নিজ দেশের ভেতরে স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সংকটের সময়ও তিনি একই ধরনের সময়সীমা ব্যবহার করেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তা থেকে প্রাপ্তি ছিল সামান্যই।
হোয়াইট হাউসে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৫ মাসে ট্রাম্প বারবার বিভিন্ন বিষয়ে একরোখা দাবি তুলেছেন এবং পরবর্তীতে আবার তা থেকে পিছুও হটেছেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত শেয়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করলে তা থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা যায় গত জানুয়ারিতে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে। সেখানে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিকানা ও স্বত্বসহ’ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি তোলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ইউরোপের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার করে তিনি সেই অবস্থান থেকেও সরে আসেন।
সে সময় পিছু হটার ব্যাখ্যায় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে তিনি ন্যাটোর প্রধানের সঙ্গে একটি ‘ভবিষ্যৎ চুক্তির রূপরেখা’য় সম্মত হয়েছেন। যদিও গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই সেখানে ব্যাপক সামরিক সুবিধা ছিল।
এদিকে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও ট্রাম্পের কৌশলগত পদক্ষেপই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের সামরিক সাফল্য সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করেছে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলকে কঠিন আলোচনায় অংশ নিতে সক্ষম করেছে এবং কূটনৈতিক সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ উন্মুক্ত করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকার স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সক্ষমতাকে কখনোই খাটো করে দেখা উচিত নয়।’