গাজায় দুই বছরব্যাপী যুদ্ধের প্রথম ১৬ মাসে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা সে সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘোষিত মৃত্যুসংখ্যার তুলনায় অন্তত ২৫ হাজার বেশি।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) এক গবেষণার মাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের অনুপাত নিয়ে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে তথ্য দিয়েছিল, তা সঠিক ছিল।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলা এবং ইসরায়েলের গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৪২ হাজার ২০০ নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গাজায় সহিংসতায় নিহতদের মোট সংখ্যার ৫৬ শতাংশ।
দ্যা গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, এই গবেষণায় অংশ নেওয়া গবেষকদের মধ্যে ছিলেন লেখক, অর্থনীতিবিদ, জনসংখ্যাবিদ, মহামারিবিদ ও জরিপ বিশেষজ্ঞ। তারা বলেছেন, ‘সমন্বিত প্রমাণ বলছে, ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজা উপত্যকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ আগ্রাসনে নিহত হয়েছে এবং সংঘাতের কারণে পরোক্ষভাবে অ-সহিংস মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্যসংখ্যক।’
গাজায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। তবে গত মাসে এক প্রবীণ ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সংকলিত মৃত্যুর তথ্য মোটামুটি সঠিক।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাছাড়া এখন পর্যন্ত নিখোঁজদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ইসরায়েলি হামলায় সরাসরি নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ৬৬০ জন ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও ৫৭০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।
গত বছর ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষকরা অনুমান করেছিলেন, যুদ্ধের প্রথম ৯ মাসে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে নিহতের সংখ্যা জানিয়েছিল, তা তাদের হিসাবের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম ছিল।
নতুন গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সরকারিভাবে ইসরায়েল প্রকাশিত নিহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখানো হয়েছিল এবং হিসাবেও গরমিল করা হয়েছে।
গবেষণাটি গাজায় ২ হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি, যেখানে জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়। জরিপটি পরিচালনা করেন মূলত অভিজ্ঞ ফিলিস্তিনি জরিপকারীরা, যারা ফিলিস্তিনসহ অন্যান্য স্থানে জরিপ কাজের জন্য পরিচিত।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচিত গবেষণার অন্যতম লেখক এবং রয়্যাল হলোওয়ে, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাট বলেন, ‘এটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জরিপ এবং অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি মানসিকভাবে কষ্টকর ছিল। তাই জরিপের সময় প্রশ্নোত্তরকালে ওইসব মানুষের মানসিক অবস্থাসহ আরও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করতে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদেরই নিযুক্ত করা হয়।’
দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংঘাতে হতাহতের হিসাব নিয়ে কাজ করা স্পাগাট জানান, নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় প্রায় ৮ হাজার ২০০ মৃত্যুর পরোক্ষ কারণ অপুষ্টি ও চিকিৎসাহীনতা। তিনি ২০২৪ সালে ল্যানসেটে প্রকাশিত আরেক গবেষণার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন, যেখানে প্রতি একটি সরাসরি মৃত্যুর বিপরীতে চারটি পরোক্ষ মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল।
স্পাগাট বলেন, ‘প্রতিটি সংঘাতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে মৃত্যুর ধরনে বড় পার্থক্য দেখা যায়। যেমন: কসোভো সংঘাতের সব মৃত্যুই ছিল সহিংস, কিন্তু দারফুরের মতো জায়গায় আবার ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। গাজায় শুরুতে অন্তত প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও একটি চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি অঞ্চলটি ছোট হওয়ায় সহায়তা পৌঁছালে মানুষকে দ্রুত সাহায্য করা সম্ভব হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটিকে কম সংখ্যক মৃত্যু বলে ভাবার সঙ্গে আমি একমত নই। আমরা এই বিষয় নিয়ে মানুষের সংবেদনশীলতা কমানোর প্রয়োজন বোধ করছি । তবে হ্যাঁ, অনেকের ধারণার তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা কম হতে পারে।’
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হন। সেই সঙ্গে ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায় হামাস। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল পাল্টা অভিযান শুরু করে। ইসরায়েল বিমান হামলা, ট্যাংক গোলাবর্ষণ ও ভারী আর্টিলারি হামলায় গাজার বড় অংশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।
গবেষণাটি ইসরায়েলের অভিযানের সবচেয়ে তীব্র ও প্রাণঘাতী সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করলেও, মানবিক সংকটের সবচেয়ে চরম সময়কে অন্তর্ভুক্ত করেনি। গত বছরের আগস্টে জাতিসংঘ-সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছিলেন।
গাজায় নিহতদের মধ্যে যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষের অনুপাত নিয়েও তীব্র বিতর্ক রয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাদের হামলায় উভয় পক্ষের সংখ্যা প্রায় সমান। তবে নতুন গবেষণা সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নভেম্বরে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ডেমোগ্রাফিক রিসার্চ-এর একদল গবেষক অনুমান করে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজায় ৭৮ হাজার ৩১৮ জন নিহত হয়েছেন যা নতুন গবেষণার সময়সীমার সঙ্গে প্রায় একই। তবে ওই গবেষণায় পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যা বেশি ধরা হয় এবং এতে ২০২৩ সালে গাজায় আয়ুষ্কাল ৪৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৪৭ শতাংশ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
স্পাগাট বলেন, সংঘাতে মোট নিহতের একটি চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল সম্পদ প্রয়োজন হবে। সাম্প্রতিক গবেষণার সংখ্যাগুলোতেও উল্লেখযোগ্য ত্রুটির সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাস্তবে কী ঘটেছিল তা পুনর্গঠনের জন্য বহু মিলিয়ন পাউন্ডের গবেষণা প্রকল্প হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। গাজায় নিহত সব মানুষের পূর্ণ হিসাব পেতে অনেক সময় লাগবে, অবশ্য যদি কখনও তা সম্ভব হয়।’