দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুদ্ধ অবসান এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তাসহ বেশ কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।
সোমবার (১৫ জুন) ঘোষিত এই সমঝোতার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার জেনেভায় আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকবে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানি হামলার কারণে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং এর প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়ে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এটি বন্ধ হয়ে যাওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালি খুললেও সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
লেবানন ইস্যুই সবচেয়ে বড় বাধা
চুক্তির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা লেবাননের পরিস্থিতি। যুদ্ধের পক্ষভুক্ত হলেও ইসরায়েল এই সমঝোতার অংশ নয়।
সোমবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট করে বলেছেন, লেবাননে দখল করা এলাকা থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানের জবাবে ইরান হামলা চালালে ‘প্রচণ্ড শক্তি’ দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের মুখপাত্র ডেভিড মেনসারও জানিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকির মোকাবিলা অব্যাহত রাখবে ইসরায়েল।
এ অবস্থান সমঝোতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। কারণ, ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে যে যুদ্ধ অবসানের যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননের সংঘাতও বন্ধ হতে হবে।
এদিকে, চুক্তি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সময় মাত্র ৬০ দিন
চুক্তির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও পারমাণবিক কর্মসূচি।
সমঝোতা অনুযায়ী, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মাত্র ৬০ দিনের সময় পাওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আশঙ্কা, এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যুর সমাধান সহজ হবে না। কারণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে বিশ্বশক্তিগুলোর কয়েক বছর সময় লেগেছিল।
উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন, যা পরবর্তী উত্তেজনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত সমঝোতা কার্যকর নয়
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, শুক্রবার আনুষ্ঠানিক চুক্তি সইয়ের আগে এসব কার্যকর হবে না।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদিও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, স্বাক্ষরের আগে ইরানও চুক্তির কোনো অংশ বাস্তবায়ন করবে না।
চুক্তি সইয়ের আগে এ সপ্তাহে কাতারের দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের প্রস্তুতিমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্বনেতাদের সতর্ক আশাবাদ
মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টিকারী এই যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন ইউরোপ, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা।
তবে অনেকেই এখনও সতর্ক। লুক্সেমবার্গের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভিয়ার বেটেল বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত এখনও অনেক সময় বাকি।’
ফলে যুদ্ধ অবসানের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও চূড়ান্ত চুক্তি সই এবং তা বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনও পুরোপুরি মসৃণ নয়।