হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণার পর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে তারা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো মার্কিন স্থাপনাতে হামলার মাধ্যমে চলমান যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেবে। যুদ্ধের শুরু থেকেই তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি প্রায় সব ধরনের সামুদ্রিক চলাচলের জন্য বন্ধ করে রেখেছে।
স্থানীয় সময় শনিবার (১৪ মার্চ) তেহরান এ হামলার হুঁশিয়ারি দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও অন্যান্য অবকাঠামোতেও হামলা চালাচ্ছে ইরান। শনিবারও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান।
শিল্প ও বাণিজ্য সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি জাহাজ সরবরাহ কেন্দ্র আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ আমিরাতে বেশ কিছু তেল বোঝাই কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। টেলিভিশনের ফুটেজে সেখান থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা গেছে।
ইরানের একজন সামরিক মুখপাত্র আরব আমিরাতের জনগণকে বন্দর, ডক এবং মার্কিন ঘাঁটি থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী ওই এলাকাগুলো থেকেই ইরানের দ্বীপগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ শনিবার রাতে বলেন, সন্ত্রাসী আগ্রাসনের মুখে নিজেদের রক্ষা করার অধিকার দেশটির রয়েছে। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, আরব আমিরাত এই চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার রাখে, তবে আমরা এখনও যুক্তি ও বুদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি এবং সংযম বজায় রেখে ইরান ও এই অঞ্চলের জন্য একটি সমাধানের পথ খুঁজছি।
গত শুক্রবার ইরানের প্রধান তেল রপ্তানিকেন্দ্র খার্গ দ্বীপে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। শনিবারও ইরানে দফায় দফায় হামলা অব্যাহত রেখেছে মার্কিন বাহিনী।
শনিবার রাতে এনবিসি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন হামলায় ওই দ্বীপের বেশিরভাগ অংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে আমরা ‘মজা করার জন্য’ আরও কয়েকবার সেখানে হামলা চালাতে পারি। তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে প্রস্তুত নয় যুক্তরাষ্ট্র। কারণ শর্তগুলো এখনও যথেষ্ট ভালো নয়।
এদিকে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানও তেরানকে লক্ষ্য করে বেশ কিছু হামলা চালিয়েছে। আধা-সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানের একটি রেফ্রিজারেটর ও হিটার কারখানায় বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা এবং শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, অনেক দেশ বিশেষ করে যারা ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রচেষ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে যাতে প্রণালিটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা যায়।
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার চেষ্টায় ট্রাম্প আরও বলেন, আশা করি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য এবং অন্যরা যারা এই কৃত্রিম বাধার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা ওই এলাকায় যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনও কোনো সুসংগত কৌশল উপস্থাপন করতে পারেনি। সাধারণত বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেছিলেন, খার্গ দ্বীপে অভিযান চালিয়ে মার্কিন বাহিনী সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে নিশ্চিহ্ন করেছে। তিনি বলেন, ভদ্রতার খাতিরে আমি দ্বীপের তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে, ইরান বা অন্য কেউ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার জন্য কিছু করে, তাহলে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে আমি দেরি করব না।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের নেতাদের ‘উন্মাদ পাপিষ্ঠ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরানের নেতারা মরিয়া হয়ে আত্মগোপন করেছেন। তারা গর্তে ঢুকেছেন।
হেগসেথ আরও দাবি করেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত এবং সম্ভবত ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। ইরান স্বীকার করেছে যে, যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি হামলায় ৫৬ বছর বয়সী খামেনি আঘাত পেয়েছেন। তবে তারা বলছেন, তার আঘাত তত গুরুতর নয়।
ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ হওয়া এখন এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। খার্গ দ্বীপ ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত এবং এটিই দেশটির তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই অঞ্চলে আমেরিকার শেয়ার রয়েছে এমন তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার প্রতিবেশী দেশগুলোকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীকে বহিষ্কারের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলি ভায়েজ বলেন, ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করছে। তিনি বলেন, কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাকে হারিয়েও, এই সরকার বেশ অক্ষত বলে মনে হচ্ছে।
অপরদিকে, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে ইরাক ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। রাতে দূতাবাস ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এই সতর্কতা জারি করা হয়।
ইরানে বোমা হামলায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ইসরায়েলে ১৩ জন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মোট ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
লেবাননেও মানবিক সংকট গভীর হচ্ছে। সেখানে ইসরায়েলি হামলায় ৮০০-র বেশি মানুষ নিহত এবং ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বৈরুত থেকে ওয়াশিংটন সব পক্ষই এখন এক চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে।
বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া রোধ করতে শিগগরিই এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে চাইবেন ট্রাম্প।
বিশেষজ্ঞরা এই সপ্তাহের শুরুতে দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, খার্গের দিকে পরিচালিত সামরিক পদক্ষেপ তেলের দাম আরও নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করবে, যা ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
চ্যাথাম হাউস থিঙ্কট্যাঙ্কের নীল কুইলিয়াম বলেন, খার্গে হামলার ফলে গত সোমবার আমরা যে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার দেখেছিলাম, তা ১৫০ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের জন্য এটি অশনি সংকেত।