নরসিংদীর মাধবদীতে আমেনা আক্তারকে (১৫) জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে মাধবদী থানায় সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিং করেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক। তিনি জানান, এ ঘটনায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে নিহতের মা ফাহিমা বেগম বাদী হয়ে মাধবদী থানায় মামলা করেছেন।
ডিআইজি রেজাউল করিম বলেন, ইতোমধ্যে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকরা হলেন— সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য আহম্মদ আলী দেওয়ান, তার ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান, নূরের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব, এবাদুল্লাহ ও গাফফার। তাদের মধ্যে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ২ জন এবং সালিশকারী ৩ জন।
তিনি আরও বলেন, বাকিদের আটকের জন্য অভিযান চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাদের আটক করব। কোনো অপরাধীরাই রেহাই পাবেন না।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন বলেন, কিশোরীকে নৃশংস ও নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানার পরপরই নরসিংদীর পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে হত্যায় জড়িতদের দ্রুত আটকের নির্দেশ দিয়েছি। যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে এ ধরনের ঘটনা সমাজে আর না ঘটে।
তিনি আরও বলেন, ধর্ষণকারীদের পক্ষে যাতে কেউ কোনো সহানুভূতি না দেখায় এবং নরসিংদী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সরকারি কৌঁসুলিকে (পিপি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যারা এ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এবং ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত তাদের যেন কোনো ধরনের আইনি সহায়তা না দেওয়া হয়; যাতে অপরাধীরা বুঝতে পারে, অপরাধ করলে আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে না; তখন ভয়ে সমাজে অপরাধও কমে যাবে।
খায়রুল কবির আরও বলেন, আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। যারা সমাজে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হবেন অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কে কোন দল করে, কে কোন দলের, কোন মতের—সেটা দেখার বিষয় না। অপরাধীদের কোনো দল নেই, তারা অপরাধী; অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স, অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে, নিহত আমেনার ময়নাতদন্ত নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. ফরিদা গুলশানারা কবিরের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের মেডিকেল-বোর্ড ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছেন।
নিহতের মা ফাহিমা বেগম জানান, কোথায় মরদেহ দাফন করা হবে, তা অনিশ্চিত। নিহত আমেনার মা, সৎ পিতা আশরাফ মিয়া ও ভাই সিফাত এখনও মাধবদী থানা হেফাজতে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে মাধবদী থানার মহিষাশুরা ইউনিয়নের কোতালিরচর দড়িকান্দী এলাকার একটি সরিষাখেত থেকে গলায় ওড়না পেচানো অবস্থায় ওই তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, নিহতের পিতা আশরাফ হোসেন বরিশালের বাসিন্দা। কাজের সুবাদে স্ত্রী-কন্যাসহ মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরার নেতৃত্বে ৫-৬ জনের একটি দল এলাকা থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। পরে বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসাও করা হয়।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে আশরাফ হোসেন তার কাজ শেষে মেয়েকে নিয়ে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বড়ইতলা এলাকায় পৌঁছলে নূরার নেতৃত্বে আবারও ৫ জন মিলে তার বাবার কাছ থেকে আমেনাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। পরে মেয়েটির পরিরেরর লোকজন বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুজির পরও না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। সকালে একই এলাকার একটি সরিষাখেত থেকে গলায় ওড়না পেচানো অবস্থায় আমেনা আক্তারের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে নিহত মেয়ের বাবা মো. আশরাফ জানান, নূরার নেতৃত্বে ৫-৬ জন লোক আমার সামনে থেকে আমার মেয়েকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে রাতে আর পাইনি। সকালে আমরা জানতে পারি আমেনার মরদেহ ঘটনাস্থলে পড়ে আছে। আমার সন্তানকে যারা হত্যা করেছে আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।