রাতভর নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে আজ রবিবার সকালে জামিন পেয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার সদস্যসচিব মাহদী হাসান।
গতকাল (শনিবার) সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পরে তাকে হবিগঞ্জ থানায় সোপর্দ করা হয়। তবে কী অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা জানতে গতকালই সংবাদকর্মীরা যোগাযোগ করলেও, হবিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) থেকে শুরু করে পুলিশ সুপার, কেউই মুখ খোলেননি।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) সকালে মাহদীকে হবিগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ সময় মাহদীর আইনজীবী আব্দুল মালেক হৃদয় মাহদির জামিনের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
এই নেতার বিরুদ্ধে বেআইনি লোকজন মিলিত হয়ে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় একটি মামলা দেখানো হয়েছে।
এদিকে, মাহদীর মুক্তির দাবিতে রাতভর হবিগঞ্জ থানার ফটকের সামনে অবস্থান নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। তারা মাহদীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে স্লোগান দেন। থানা এলাকার পরিস্থিতির অবনতি যাতে না ঘটে, সেজন্য পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও র্যাব মোতায়েন করা হয়। এছাড়া গতরাতে রাজধানীর শাহবাগে জড়ো হয়েও মাহদীর মুক্তির দাবি জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে রাত সোয়া ১টার দিকে পুলিশ একটি মাইক্রোবাসে করে মাহদীকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতেই তাকে আদালতের মাধ্যমে জামিন দেওয়ার প্রস্তুতির কথা শোনা গেলেও বিচারক না আসায় তাকে কোর্ট হাজতে রাখা হয়।
উল্লেখ্য, শায়েস্তাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি এনামুল হাসান নয়নকে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন।
নয়নকে আটকের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার নেতা-কর্মীরা তার মুক্তির দাবিতে শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুপুরে শায়েস্তাগঞ্জ থানা ঘেরাও করেন। এ সময় জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার আন্দোলনের সদস্যসচিব মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল নেতা-কর্মী ওসির কক্ষে অবস্থান নেন। তারা দাবি করেন, নয়ন একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে তিনি জুলাই আন্দোলনে জড়িত হন। তারা নয়নকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি করেন।
আটক ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নিতে একপর্যায়ে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ওসির সঙ্গে তর্কে জড়ান মাহদী হাসান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাহদী ওসিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকার গঠন করেছি। এই জায়গায় আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আপনারা আমাদের ছেলেদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছেন। আবার আমাদের সঙ্গে বার্গেনিং করছেন। আপনি (ওসি) বলেছেন, “আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে?”’ একপর্যায়ে মাহদী হাসান ওসিকে বলেন, ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম; এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি (ওসি) কোন সাহসে এটা (আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে) বললেন। আমি স্ট্রিকলি এখানে আসছি। আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছে নাকি?’
খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ছুটে যান। তার মধ্যস্থতায় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এনামুল হাসানকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এ বিষয়ে মাহদী হাসান বলেন, ‘আটক হওয়া ছাত্রনেতা একসময় ছাত্রলীগ করলেও তিনি জুলাই আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। শুধু তার অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে আসে।’
মাহদী প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মূল সমন্বয়কারীদের একজন সারজিস আলম। তিনিও তো একসময় ছাত্রলীগ করেছেন। তাহলে তিনিও কি অপরাধী?’ তিনি দাবি করেন, তাদের তিন নেতা-কর্মীকে আটক করে শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ আগেও ‘অপরাধ’ করেছে।
বানিয়াচং থানা জ্বালিয়ে দেওয়া ও পুলিশকে পুড়িয়ে ফেলার মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি স্লিপ অব টাং (মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে)।’
তবে, ওই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাহদীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুস্পষ্ট জবাব দিতে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেনের সই করা একটি শোকজ নোটিশ গতকাল বিকেলে প্রকাশিত হয়। একইসঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সংগঠনের কার্যক্রম থেকে তাকে বিরত থাকতেও নোটিশে বলা হয়েছে। কারণ দর্শনোর নোটিশ মাহদী পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা তাকে (এনামুল) বৈষম্যবিরোধী একটি মামলায় সন্দেহভাজন ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আটক করি। ওই দিন রাত বেশি হওয়ায় আমরা যাচাই-বাছাই করতে পারিনি। পরদিন নানাভাবে তথ্য নিয়ে আমরা জানতে পেরেছি, আটক হওয়া ব্যক্তি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন। পরে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’