জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট সব মামলার তদন্ত ও বিচার আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। একই সঙ্গে গুম ও কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোর তদন্তও চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বছরের আগস্ট থেকে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনাল বিচারকাজ পরিচালনা করছে। তদন্ত সংস্থায় ২৩ জন এবং প্রসিকিউশন টিমে ২০ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধের মামলায় তদন্ত ও বিচার দুই প্রক্রিয়াই সময়সাপেক্ষ। এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায় হয়েছে। প্রতিটি মামলার বিচার শুরুর আগে দীর্ঘ সময় তদন্ত হয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্কসহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে রায় দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়, দেড় বছরের মধ্যে ছয়টি মামলার বিচার শেষ করা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্ভব হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, চলতি মাসেই আরও তিনটি মামলার রায় হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মামলায় যুক্তিতর্ক চলছে। মাহবুবুল আলম হানিফের মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এছাড়া যাত্রাবাড়ীতে তাইম ভূঁইয়া হত্যা মামলার যুক্তিতর্কও শিগগির শুরু হবে। আরও কয়েকটি মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে যাতে অন্তত জুলাইয়ের সমস্ত বিচার আমরা শেষ করতে পারি, সেই বিষয়ে আমরা একটা কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি) নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেলেও গুম ও কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোর তদন্তও সমানভাবে এগিয়ে চলছে। কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা এবং শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ১২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হচ্ছে।
ছয়টি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের অধিকাংশই পলাতক। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণের আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব নয়। তবে যেসব মামলায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও অর্থদণ্ডের আদেশ রয়েছে, সেগুলো কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে অর্থ দেওয়ার নজির না থাকায় বিষয়টি নিয়ে আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তদন্তে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ বা বাছাই করে আসামি করার অভিযোগ নাকচ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করেন। প্রসিকিউশন তদন্তে হস্তক্ষেপ করে না। কোনো তদন্ত নিয়ে গ্রহণযোগ্য অভিযোগ এলে তা পর্যালোচনা করা হয়। প্রয়োজন হলে তদন্ত প্রতিবেদন ফেরত পাঠানো বা নতুন করে অভিযোগ গঠনও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামির আপিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনে ‘অটোমেটিক আপিল’ বলে কিছু নেই। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আপিল ‘অ্যাজ অব রাইট’ হলেও পলাতক অবস্থায় সেই সুবিধা কার্যকর হয় না।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে এতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় দেখা যাচ্ছে না। পরিকল্পিত ও ব্যাপক আকারে সংঘটিত গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য হবে, আর বিচ্ছিন্ন গুমের ঘটনা নতুন আইনের আওতায় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিচার হবে।
তিনি আরও জানান, একই ধরনের ঘটনার পৃথক তদন্তের পরিবর্তে একাধিক ঘটনাকে একত্র করে তদন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে তদন্ত ও বিচার—উভয় প্রক্রিয়াই আরও কার্যকর ও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।