বাংলাদেশে একটি নির্ভরযোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস ইয়াবস। তিনি বলেছেন, ‘সামগ্রিক নির্বাচনি পরিবেশ ইতিবাচক। এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।’
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক সংবাদ সম্মেলনে ইভারস ইয়াবস এসব কথা বলেন।
ইভারস ইয়াবস বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যক্ষ করার প্রত্যাশা করছে। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ক্ষমতার জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন নীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশে তাদের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রার্থী এবং দেশের এলাকায় সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। সাধারণ পরিবেশ খুব ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। যাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই জোর দিয়ে বলেছেন যে এটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও গণতন্ত্রে একটি নতুন অধ্যায় হতে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ইইউ প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, ‘মিশনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বাহিনী, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।’
নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ইয়াবস বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক বিষয়। নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক করতে সব সম্প্রদায়, সংখ্যালঘু এবং বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ মিশনের বিশেষ নজরে থাকবে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের ৬৪টি জেলায় ইইউ মিশনের ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে বলে জানান তিনি। ইয়াবস জানান, এই স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকরা ভোটকেন্দ্র খোলা, ভোটগ্রহণ, ভোটকেন্দ্র বন্ধ, ব্যালট গণনা এবং ফলাফল তালিকাবদ্ধসহ নির্বাচনের সার্বিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।
তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকরা শহর, নগর ও গ্রামে প্রায় প্রতিটি সংসদীয় আসনে উপস্থিত থাকবেন। তাদের সারা দিনের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন এই ঐতিহাসিক নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হবে।
এই পর্যবেক্ষক বলেন, দেশজুড়ে মোট ২০০ জন পর্যবেক্ষক মোতায়েন করার মাধ্যমে তারা এই নির্বাচনের স্বচ্ছতায় অবদান রাখছেন। এই বিশাল এবং নিবেদিতপ্রাণ মিশন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অটুট অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
প্রাক-নির্বাচনি প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করা সমীচীন নয়। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে এবং তখন এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।
‘নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের কাজ হলো নিরপেক্ষ থাকা এবং কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জড়িত না হওয়া। নির্বাচন শেষে প্রায় দুই মাস পর প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পর্যবেক্ষকরা ইউরোপের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করবেন। তাদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ভালো, অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য এবং অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে আগ্রহী।’
এর আগে, গত মাসে মিশনটির ৫৬ জন প্রতিনিধি দীর্ঘ মেয়াদে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে ঢাকায় আসেন। তারা নির্বাচন-পূর্ব পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রস্তুতি, নির্বাচনি প্রচারণা, ভোটার শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের একটি প্রতিনিধিদল মিশনটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। পূর্ণ সক্ষমতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যরাষ্ট্র ছাড়াও কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক এই মিশনে পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন।
নির্বাচনের দুই দিন পর, অর্থাৎ আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে একটি প্রাথমিক বিবৃতি দেবে ইইউ মিশন। ওইদিন ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে তাদের। তার দুই মাসের মধ্যে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবে তারা।
ইভারস ইয়াবস জানিয়েছেন, ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত ‘আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা’ অনুযায়ী তাদের মিশনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের সবাই কঠোর আচরণবিধি মেনে চলবেন।