ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে দেশটির রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় হামলা চালায় তারা।
প্রথম দৃশ্যমান হামলাটি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় হয়েছে বলে জানা গেছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে হামলার খবর দিয়েছে ইরানি গণমাধ্যম। প্রকাশিত ভিডিওতে রাজধানী তেহরান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।
এদিকে, ফ্লোরিডার পাম বিচে নিজের বাসভবন মার-আ-লাগো থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানে ‘বৃহৎ সামরিক অভিযান’ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেছেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হচ্ছে ‘ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি নির্মূল করে যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষা দেওয়া।’
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, এই অভিযানে মার্কিনিদের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। সাহসী মার্কিন সেনানায়কদের প্রাণ হারাতে হতে পারে, হতাহতও হতে পারে। যুদ্ধে এমনই ঘটে।
একইসঙ্গে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন সেনা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডকেও হুমকিতে ফেলতে পারে।
শনিবারের হামলাকে তিনি ‘বৃহৎ ও চলমান অভিযান’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এর উদ্দেশ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি ধ্বংস করা, নৌবাহিনীকে অকার্যকর করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পথ রুদ্ধ করা।
ইরানি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘অস্ত্র সমর্পণ করুন, নয়তো নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন।’ সেই সঙ্গে ইরানের জনগণকে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নতুন হামলার পটভূমি
হামলার আগের দিন শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় অগ্রগতির অভাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
হোয়াইট হাউস ত্যাগের সময় তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের যা দরকার তা দিতে রাজি নয়। এতে আমি সন্তুষ্ট নই। তারা পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারে না।’
সে সময় সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছিলেন তিনি, যদিও সম্ভাব্য হামলা নিয়ে সরাসরি কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান।
গত জুন মাসে ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কিছু পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ইরান দাবি করেছে, এরপর থেকে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ রেখেছে। কিন্তু ওই সময় বোমাবর্ষণের শিকার স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
ইরান বর্তমানে স্ব-আরোপিত সীমাবদ্ধতায় তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত সীমিত রেখেছে। এরপরও মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চল এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু অংশ ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় পড়ে।
আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের প্রকাশ্য প্রমাণ না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে।
ইরানের পাল্টা জবাব ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
হামলার পর ইরানের আধা-সামরিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) জানায়, তারা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রথম দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এরই মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। তবে তারপরও ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল থেকে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের হামলার পর শুধু ইসরায়েল নয়, জর্ডানেও সাইরেন বেজে ওঠে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের পক্ষ থেকে সৃষ্ট ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষ্যে, ‘এই যৌথ অভিযান সাহসী ইরানি জনগণের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে।’
ইসরায়েলের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশটির আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হয়েছে। অবতরণের পথে থাকা উড়োজাহাজগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং অপেক্ষমাণ যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের প্রতিবেশী ইরাকও তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় জানায়, আকাশসীমা বন্ধের আগে সব বিমান চলাচল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, তারা আবারও ইসরায়েল ও সমুদ্রপথ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করবে।
এ বিষয়ে হুথির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রথম হামলা আজ রাতেই হতে পারে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এক সমঝোতার অংশ হিসেবে লোহিত সাগরে হামলা স্থগিত করেছিলেন হুথি যোদ্ধারা।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি
হামলার আগে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটায়। জানুয়ারির শেষে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও তিনটি গাইডেড-মিসাইল ধ্বংসকারী রণতরী (ডেস্ট্রয়ার) ওই অঞ্চলে পৌঁছায়। পরে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও চারটি ডেস্ট্রয়ার ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়ে বর্তমানে ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে।
এসব সমরযানে যুক্ত হয়ে ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত ১০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন হয়েছে।
কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হাজারো মার্কিন সেনাসদস্য অবস্থান করছেন। বড় আকারের হামলার উপযোগী শত শত যুদ্ধবিমান ও সহায়ক উড়োজাহাজও সেখানে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, সব কর্মীকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দিয়েছে কাতারে মার্কিন দূতাবাস। পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদেরও একই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তেহরানের বিভিন্ন এলাকা থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মেহরাবাদ বিমানবন্দর এলাকায় দুটি ভারী বিস্ফোরণে জানালা কেঁপে ওঠার কথা জানান এক বাসিন্দা। ভানাক এলাকায় আরেকজন প্রায় একই সময়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা বলেন।
পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকায় হতাহতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে সামরিক, কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে চলেছে।