ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার দিনমজুর আজিজুর রহমানের জীবনের করুণ পরিণতি নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো জেলার মানুষকে। সীমান্তে ঘাস কাটতে গিয়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী—বিএসএফের হাতে আটক হওয়ার প্রায় ১১ মাস পর অবশেষে লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন তিনি।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় শুক্রবার (৩ এপ্রিল) পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে তার মরদেহ দেশে আনা হয়। সকালেই মরদেহ হস্তান্তরের কথা থাকলেও স্বজনরা বিকেল ৪টার দিকে মরদেহটি গ্রহণ করেন।
আজিজুরের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার শাহানাবাদ গ্রামে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারি ও শোকের মাতমে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এ সময় তার স্ত্রী তাসকারা বারবার চিৎকার করে বলেন, ‘বিএসএফের নির্যাতনেই আমার স্বামী মারা গেছে। ঘাস কাটতে যাওয়া কোনো অন্যায় হতে পারে না।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সারোয়ার মোহাম্মদ শাহরিয়ার খানের সই করা ২ এপ্রিলের এক আদেশে জানানো হয়, গত ২২ মার্চ ভারতে মৃত্যুবরণকারী আজিজুর রহমানের মরদেহ সরকারি খরচে দেশে ফিরিয়ে আনতে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে মরদেহটি প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৩ মে দুপুরে রাণীশংকৈল উপজেলার শাহানাবাদ গ্রামের দিনমজুর আজিজুর রহমানসহ চারজন সীমান্ত এলাকায় ঘাস কাটতে যান। তারা সীমান্ত পিলার ৩৭৩/১-এসের কাছে পৌঁছালে ভারতের ১৮৪ আমবাড়ী ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় তিনজন পালিয়ে এলেও আজিজুর রহমান ধরা পড়েন।
আজিজুরের স্ত্রী তাসকারা বেগম অভিযোগ করেন, আমার স্বামীকে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে গিয়ে বিএসএফ সদস্যরা পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। নির্যাতনের কারণে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ১১ মাস ভারতে বন্দি অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২২ মার্চ ভারতের ইসলামপুরের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ভারতে অবস্থানরত আত্মীয়দের মাধ্যমেই আমরা এই মর্মান্তিক সংবাদ জানতে পারি।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজীর আহমেদ জানান, দেশে আনার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা আরও কঠোর অবস্থানে যাব। একইসঙ্গে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সীমান্তের মানুষদের কাঁটাতারের বেড়া ও নো ম্যানস ল্যান্ড এলাকায় না যাওয়ার জন্য আমরা নিষেধ করেছেন তিনি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়ার পর রাতেই তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। মরদেহ নষ্ট হতে শুরু করায় তা আর রাখা সম্ভব হয়নি বলেই দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সীমান্তের মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সীমান্তে যে কোনো ঘটনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও লাশ হয়ে ফিরে আসার ঘটনা মানতে নারাজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তের বাসিন্দারা।