চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটে। ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে উৎসবমূখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন দেশের কোটি কোটি ভোটার।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই দেশের নানা প্রান্তের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে বাড়তে থাকে ভোটারদের ভিড়। তার মধ্যে বয়স্ক ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলা ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় গণনা। ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা স্বতস্ফূর্ত ছিল তার দেখা মেলে ভোট পড়ার হারে। গতকাল রাত ৯টার দিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানায়, কয়েকটি কেন্দ্র বাদে গড়ে ৬০.৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোটের আগের রাত পর্যন্ত নানা আশঙ্কা ও উদ্বেগের কথা শোনা গেলেও ভোটগ্রহণের দিন বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই দেশের ২৯৯টি আসনের ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। কোথাও কোথাও হাতাহাতি বা উত্তেজনার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ছিল শান্তিপূর্ণ।
শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮৯টি আসনের বেসরকারি ফল জানা গেছে। তাতে ২১০টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭২ আসন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়লাভ করেছেন।
ফলে বিএনপির নেতৃত্বেই গঠিত হতে যাচ্ছে আগামী সরকার। নতুন এই সরকারের নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে ৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সর্বশেষ এরশাদ জমানায় ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন কাজি জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালে তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার হাতেই ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের ব্যাটন।
এই দুই নেত্রীর ক্ষমতায় আসা এবং এর চূড়ায় আরোহণ করাটাও ছিল পরিস্থিতির চাহিদায়। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন খালেদা জিয়ার স্বামী এবং বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই দুই ঘটনাই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ঠেলে দিয়েছিল রাজনীতির আঙিনায়। এরপর রাজনীতির অঙ্গনে তাদের লড়াই ছিল নজরকাড়া। তবে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সেই অবস্থার অবসান ঘটছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হয়েছেন গত ৩০ ডিসেম্বর। অন্যদিকে, টানা ১৭ বছর দেশ শাসনের পর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের শাসনক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তিনিও যে আর সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবেন না, তা শোনা গেছে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মুখেই।
এর মধ্য দিয়ে যে নতুন নেতৃত্বের চাহিদা তৈরি হয়েছিল দেশের রাজনীতিতে, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রায় দুই যুগ পর লন্ডন থেকে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আবেগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।
দেশের ফেরার পর থেকে ভোটের মাঠ, সব জায়গায় তার প্রকাশিত পরিকল্পনার মধ্যে প্রধানতম ছিল— সবার আগে বাংলাদেশ, দেশের তরুণদের দক্ষ করে তোলা, নারীদের উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও দেশের কৃষকদের কল্যাণ।
কৃষিপ্রধান এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। আর তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী। এই তরুণ সমাজের কাঁধে ভর করেই যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে তা-ই দৃশ্যমান হয়েছে।
ওই আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্বদানকারী অধিকাংশ তরুণ নেতাকেই দেশের সাধারণ জনগণ স্বীকৃতি দিয়েছে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। ভোটের আগে সাধারণ মানুষের চোখের মণি হয়ে ওঠা শরীফ ওসমান হাদির কথাও মানুষ ভোলেনি। নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেও অকালে চলে যাওয়া এই তরুণ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বারবার; নানাজনের আলাপচারিতায়, ফেসবুক পোস্টে ফিরে এসেছেন তিনি।
তাই তারুণ্যকে সঙ্গে নিয়ে শিল্প-প্রযুক্তিখাতকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দেশের কৃষক ও নারীর উন্নয়নই যে সত্যিকারের উন্নয়নের চাবিকাঠি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই তিনের ওপরই বারবার জোর দিয়েছেন তারেক রহমান।
এখন দেশের শাসনভার কাঁধে নিয়ে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন এই নেতা, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা।