টানা চার দিনের ভারী বর্ষণের ফলে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় পাহাড় ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় এক শিশুসহ দুই পরিবারের ৫ জন নিহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোরে উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি মিশন পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন— মো. ইউনুছ (২৮), তার স্ত্রী রানু আক্তার (২২) ও চার বছরের ছেলে মো. সোলেমান এবং অপর পরিবারের মো. জুয়েল ( ২৭) ও তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩)।
অন্যদিকে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের এক হাজার ঘরবাড়ি প্লাবিত ও পাহাড় ধসে পড়ে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধস্ত হয়েছে। এছাড়া লামা-আলীকদম সড়কের কেয়ারারঝিরি, রেপারপাড়া আবাসিক ও লাইনঝিরি এলাকা ঢলের পানিতে ডুবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এ ছাড়াও, টানা ভারী বর্ষণে বিভিন্ন ইউনিয়নে চলতি মৌসুমের বীজতলা এবং বিভিন্ন ফসলাদি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সড়কের উপর পাহাড় ধসে পড়ে, সড়ক ধসে ও ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়ে অভ্যন্তরীণসহ লামা-আলীকদম সড়ক যোগযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, উজান থেকে নেমে আসা সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের পানি পৌর এলাকাসহ উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের নিচু এলাকায় ঢুকে পড়ে। এতে ওইসব এলাকার ঘরবাড়ি, দোকানপাট, সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়।
মাতামুহুরী নদী, লামা খাল, বমু খাল, ইয়াংছা খাল, বগাইছড়ি খাল, ও পোপা খালসহ বিভিন্ন স্থানের পাহাড়ি ঝিরিগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে বিভিন্ন পেশাজীবির প্রায় ১২ হাজার মানুষ। কর্মহীন হয়ে বেকায়দায় পড়েছে ওইসব এলাকার শ্রমজীবি মানুষগুলো।
গত মঙ্গলবার সকাল থেকে শহরের দোকান ও ঘরবাড়ির মালামালসহ গৃহপালিত পশু নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বন্যা আক্রান্তরা।
এদিকে, প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসে প্রাণহানির আশঙ্কায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে আশ্রয় নিতে বিভিন্ন মাধ্যমে মাইকিং শুরু করে উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো। এর পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা আশিকার উদ্যোগেও দুর্যোগ আগাম বার্তা ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দুর্যোগকবলিতরা আশ্রয় নিতে ৫৫ বিদ্যালয়কে অস্থায়ী আশ্রয়ন কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয় প্রশাসন। এতে কয়েকশ পরিবার আশ্রয়ন নিয়েছে।
আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুর নাগাদ মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়।
টানা ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে ভয়াবহ বন্যাসহ পাহাড় ধসে আরও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন আজিনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, অব্যাহত ভারী বর্ষণের ফলে আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়ায় আজ ভোর ৪টার দিকে পৃথকভাবে আচমকা পাহাড় ধসে মো. ইউনুছ ও জুয়েল এর বসত ঘরের ওপর পড়ে।
খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করেন। কিন্তু ততক্ষণে দুই পরিবারের ঘুমন্ত ৫ সদস্য নিহত হন।
এর আগে, রাত দেড়টার দিকে ইউনিয়নের উত্তর পাড়ায় আজিজনগর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রেহানা বেগমের ঘরে পাহাড় ধসে পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক জানান, তার ইউনিয়নে ৫০টির মতো ঘরবাড়ি পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লামা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম জানান, পাহাড় ধসে ৫০টি ও ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে ১০০ ঘরবাড়ি। পানিবন্দি হয়েছে ১ হাজার পরিবার।
ফাসিয়াখালী ইউনিয়নে ব্যাপক হারে পাহাড় ধসে ঘরবাড়ি ও রাস্তা ঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয় বলে জানান ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জিয়াবুল হক।
এছাড়া গজালিয়া, সরই, রুপসীপাড়া ইউনিয়নেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে জানা গেছে।
পাহাড় ধসে পাঁচজন নিহত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে লামা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কাইছার হামিদ বলেন, পাহাড় ধসে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক।
এ বিষয়ে লামা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন বলেন, টানা বর্ষণের শুরুতেই ঢলের পানিতে ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিপূর্ণ পৌরবাসিদের যথাসময়ে নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। শুধু তাই নয়, বাড়ি বাড়ি গিয়েও তাগাদা দেওয়া হয়। এরপরেও পাহাড় ধসে আজিজনগরের মিশন পাড়ায় শিশুসহ ৫ জন নিহত ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে এক হাজারের মত দোকানপাট-ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রসহ বন্যাকবলিতদের মাঝে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল না থাকায় ও রাস্তা-ঘাট ভেঙে তছনছ হওয়ার কারণে আজ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি।