কঠোর অবস্থান নিয়েও মাদক পাচার ও ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাটে। মাদকের হটস্পটের কলঙ্ক ঘুচতে পারছে না প্রশাসন। নিত্যনতুন কৌশলে সীমান্তের মাদক সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। হাতের কাছে মাদক পেয়ে ধ্বংস হচ্ছে জেলার যুবসমাজ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার পাশ দিয়ে ২৮১ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। যার মধ্যে কিছু সীমান্ত রয়েছে কাঁটাতারের বেড়াহীন। কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও চোরাচালানে থেমে নেই পাচারকারীরা। বিভিন্ন কৌশলে কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে রাতের আঁধারে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসছে ভারতীয় মদ, হিরোইন, ফেন্সিডিল, গাঁজা, ইয়াবা, টাপেন্টারসহ নানান জাতের মাদকদ্রব্য। প্রথমে পাচারকারীরা ভারত থেকে নিয়ে এসে সীমান্তঘেঁষা আস্তানায় রাখে। এরপর সুযোগ মতো ছড়িয়ে দেয় সারা দেশে।
সীমান্তের গ্রামগুলোতে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। সন্ধ্যা হলে এসব গ্রামে বহিরাগত মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। চা পানের দোকানে, বিভিন্ন সড়কের মোড়ে ও স্টেশনে ছদ্মবেশে বিক্রি হচ্ছে মাদক। এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন চিহ্নিত কিছু ব্যবসায়ী। এদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দলের নেতা-কর্মীদেরও সখ্যতা বেশ।
স্থানীয়রা জানান, জেলার আদিতমারী ও কালীগঞ্জ উপজেলার কিছু পয়েন্ট হয়ে উঠেছে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট। যেখান দিয়ে ভারতীয় মদ ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। ২০২১ সালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল ইউনিয়নে স্থাপন করা হয় একটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র। এরপর থেকে অভিযান বাড়লেও বন্ধ হয়নি মাদক। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানেও যেন টিকেই আছে শক্তিশালী মাদক নেটওয়ার্ক।
গোড়ল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরল আমিন বাদশার বিরুদ্ধে রয়েছে ১৪টি মাদক মামলা। স্ত্রী, ছেলে ও ভাইয়ের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মাদক মামলা। তবুও তিনি এলাকায় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি। বাদশা বলেন, একটা সময় মাদকের ব্যবসা করতাম। পরে ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু পুলিশ এখনও হয়রানি করে।
চন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আলো ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মাদক মামলা। তাদের মূল পেশা মাদক ব্যবসা।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে কিছুটা কমেছে মাদকদ্রব্য পাচার ও বিক্রি। ঈদকে সামনে রেখে আবারও বেপরোয়া হচ্ছে মাদক পাচার চক্র। তবে কঠোর নজরদারিতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে প্রশাসন।
লালমনিরহাটে দফায় দফায় পুলিশি অভিযান, একের পর এক মামলা করেও কমছে না মাদক। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ, পুলিশের রাতভর অভিযান সবই ব্যর্থ হয়ে পড়ছে প্রভাবশালী মাদক চক্রের কাছে। লালমনিরহাটের সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলো যেন এক অদৃশ্য অন্ধকারে আটকে গেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ২০টি মাদক মামলায় ২২ জন মাদক বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ।
এসব মামলায় যাবজ্জীবন সাজাও দিচ্ছেন আদালত। তবুও মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মাদক নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রতি তাগিদ দিচ্ছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্কুল-শিক্ষক সঞ্জয় কুমার বলেন, অনেককে দেখেছি, মাদক ব্যবসা ছেড়ে ভালো হতে ওসি-এসপির হাতে ফুল দিয়ে শপথ করেছেন। তারা কিছুদিন ভালো থাকলেও ওইসব এসপি-ওসির বদলির পরে পুনরায় আগের পেশায় ফিরে গেছেন। তাই, আত্নসমর্পনে কোনো কাজ হবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে আইনের যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে।
কলেজ-শিক্ষক তাপষ কুমার পাল বলেন, মাদক পাচার রোধ করতে হবে। হাতের কাছে মাদক পেয়ে অনেকের আসক্তির সুযোগ থাকে। অপরদিকে, যারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন তারা যেন সাজাভোগ ছাড়া কোনোভাবে ফাঁকফোকর দিয়ে বেড়িয়ে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক দেখেছি, মাদকের মামলায় হাজত থেকে বেড়িয়ে পুনরায় দ্বিগুণ গতিতে মাদক পাচারে ঝুঁকে পড়ছে। কারণ, মামলা হলে তার খরচ রয়েছে, যার অর্থ যোগান দিতেও অনেকেই পেশা বদল করছেন না।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম সাফওয়ান হোসেন বলেন, মাদক যুবসমাজকে ধ্বংস করছে। জুমার খুতবাতে মাদক নিয়ে আলোচনা করা হয়। মুলত, সচেতনতা বাড়াতে না পারলে এসব সামাজিক ব্যাধি শুধু আইন দিয়ে বন্ধ করা যায় না। তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে মাদকের দৌড়াত্ম্য কিছুটা কমেছে।
লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, নির্বাচন-পূর্ব আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মাদকের অভিযান কিছুটা কম ছিল। তাই সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মাদকের প্রাদুর্ভাব কিছুটা বাড়লেও নির্বাচন পরবর্তীতে নতুন কৌশলে দফায় দফায় অভিযানে মাদকের কারবার কিছুটা কমতে শুরু করেছে। আমরা বিজিবিকে সঙ্গে নিয়েও যৌথ অভিযান পরিচালনা করে থাকি। মাদকের সঙ্গে কোনো আপস নয়। মাদক নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে দিনরাত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।