পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলায় ইরানকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছে রাশিয়া। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে অবগত এমন দুইজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা বলেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলা এবং এর বিপরীতে মার্কিন সামরিক ঘাটি ও মিত্রদের ওপর ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাঝে রাশিয়া এ তথ্য দিয়ে ইরানকে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিতে বলছে কি না—এমন কোনো প্রমাণ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনও পায়নি।
তবুও, এক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে মস্কোর জড়িত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তেহরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এমন গুটিকয়েক দেশের মধ্যে রাশিয়া অন্যতম। অন্যদিকে, পারমাণবিক কর্মসূচি চালু রাখা, হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথি বিদ্রোহীদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের কারণে ইরান বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৬ মার্চ) সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে ক্রীড়াবিদদের বেতন-সংক্রান্ত একটি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এ প্রসঙ্গ তোলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সাংবাদিককে তিরস্কার করেন।
ফক্স নিউজের সাংবাদিক পিটার ডুসিকে তিনি বলেন, আমি আপনাকে অনেক সম্মান করি, আপনি সব সময় আমার প্রতি খুব সদয় ছিলেন। কিন্তু এই সময়ে এই প্রশ্নটি বোকামিপূর্ণ নয় কি? আমরা এখন অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলছি।
হোয়াইট হাউস কর্মকর্তারা এই প্রতিবেদনগুলোকে গুরুত্ব না দিলেও রাশিয়া যে এ অঞ্চলে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করছে, তা অস্বীকার করেননি।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ইরানে আমাদের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে এটি স্পষ্টতই কোনো পার্থক্য আনছে না, কারণ আমরা তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিচ্ছি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শুক্রবার সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, রাশিয়া ইরানকে সহায়তা করছে কি না, সে বিষয়সহ যুক্তরাষ্ট্র সবকিছুর ওপর নজর রাখছে এবং আমাদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, আমেরিকার জনগণ আশ্বস্ত থাকতে পারেন যে, তাদের কমান্ডার-ইন-চিফ (প্রেসিডেন্ট) ভালো করেই জানেন, কে কার সঙ্গে কথা বলছে। জনসম্মুখে হোক বা গোপনে, অনুচিত যেকোনো কিছুকেই কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধে রাশিয়ার সহায়তার বিষয়ে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে লেভিট কিছু বলতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, ইরানকে কোনো সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, তেহরানের পক্ষ থেকে এমন কোনো অনুরোধ আসেনি।
শুক্রবার তিনি বলেন, আমরা ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছি এবং অবশ্যই তা চলবে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর মস্কো কোনো সামরিক বা গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এর আগে, বাইডেন প্রশাসন দাবি করেছিল যে, ইরান রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করছে এবং রাশিয়ায় ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনে সহায়তা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রথম প্রকাশ করেছিল মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে এই তথ্য প্রকাশ ট্রাম্পের বিশ্বাসকে টলিয়ে দিয়েছে কি না যে, পুতিন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো শান্তি চুক্তি করতে সক্ষম, লিভিট বলেন, আমি মনে করি রাষ্ট্রপতি বলবেন যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে শান্তি এখনও অর্জনযোগ্য একটি লক্ষ্য।
অপরদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা ইরানের শাহেদ ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগাতে চাইছে। তেহরান ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য রাশিয়াকে যে ড্রোন দিচ্ছে, এখন সেগুলোই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেছেন, তিনি সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান এবং কুয়েতের সঙ্গে কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওলগা স্টেফানিশিনা বলেন, ইউক্রেন জানে কীভাবে শাহেদ ড্রোনের হামলা থেকে রক্ষা পেতে হয়। আমাদের অংশীদারদের প্রয়োজনে আমরা সবসময় সাহায্য করতে প্রস্তুত।
এদিকে, ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। জেলেনস্কির সঙ্গে তার সম্পর্কও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রায়ই ইউক্রেনকে রাশিয়ার দাবি মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন; এর মধ্যে রয়েছে এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড মস্কোকে ছেড়ে দেওয়া।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের ফলে মার্কিন অস্ত্রের মজুদ কমে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে পেন্টাগন প্রশ্নের মুখে থাকায় ট্রাম্প এই সপ্তাহে অভিযোগ করেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের উচ্চমানের অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন। ফলে তিনি মার্কিন অস্ত্রের মজুদ পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।