‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার’ কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রাখা নিজেদের ৮৬ টন সোনা যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংকটের সময় দ্রুত সোনা ব্যবহার বা লেনদেন করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
স্থানীয় সময় বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্য নেদারল্যান্ডস ব্যাংক (ডিএনবি) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
ডিএনবির মতে, নিউইয়র্ক ও অটোয়ার তুলনায় লন্ডনে রাখা সোনা দ্রুত ও সহজে লেনদেন করা যায়। ফলে সংকটের সময় তা দ্রুত কাজে লাগানো সম্ভব।
এ বিষয়ে ডিএনবির প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লেইপেন বলেন, ‘এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা আমাদের সোনার মজুত ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়িয়েছি। আমরা আশা করি, আমাদের কখনোই এসব সোনা ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না। তবে আমাদের প্রস্তুতি ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’
ডিএনবি আরও জানায়, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নেদারল্যান্ডসের মোট সোনার মজুত ছিল ৬১২ দশমিক ৪ টন। ওই সময় এর মূল্য ছিল ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো, যা প্রায় ৮৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
সোনা সরানোর আগে নেদারল্যান্ডসের মোট সোনার ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল নিউইয়র্কে। আর ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল কানাডার রাজধানী অটোয়ায়।
৮৬ টন সোনা সরিয়ে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা—উভয় দেশেই নেদারল্যান্ডসের মোট সোনার মজুতের পরিমাণ কমে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে লন্ডনে থাকা সোনার পরিমাণ ১৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। আর নেদারল্যান্ডসের নিজস্ব ভূখণ্ডে এখনও মোট সোনার ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ রয়েছে।
ডিএনবি বলছে, সোনা সরানোর ক্ষেত্রে শুধু শারীরিকভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া হয়নি। এর পাশাপাশি কিছু সোনা কেনাবেচাও করা হয়েছে।
ব্যাংকটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ২৭ টনের বেশি সোনা সরাসরি নেদারল্যান্ডসের জেইস্টে নেওয়া হয়। পরে একই পরিমাণ সোনা জেইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। এতে সোনার বারগুলো গলিয়ে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি।
ডিএনবি বলেছে, ‘কেনাবেচা ও সরাসরি পরিবহনের সমন্বয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সোনা সরানোর ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।’
চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে ব্যাংকটি জানিয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসভিত্তিক ন্যাশনাল গোল্ড কাউন্টারের প্রেসিডেন্ট লরেন্ট শোয়ার্টজ বলেন, এক দশক ধরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সোনার মজুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে আসছে। এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সোনা রাখার জন্য অন্য জায়গাকে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, লন্ডনের সোনার বাজার বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও তারল্যপূর্ণ বাজারগুলোর একটি। তাই সংকটের সময় সেখানে থাকা সোনা দ্রুত ব্যবহার করা সহজ।
শোয়ার্টজ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অন্য ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সহজে তাদের সোনা ঋণ দিতে পারে।’
সিটে জেস্টিওন প্রাইভেট ব্যাংকের বিশ্লেষক জন প্লাসার্ড বলেন, নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হলো ‘কোনো সংকট দেখা দিলে সোনার আরও তাৎক্ষণিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।’
তিনি আরও বলেন, আপাতত এটি বেশ একক একটি পদক্ষেপ। তবে অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও একইভাবে সোনা সরিয়ে নিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
চলতি বছরের শুরুতে নিউইয়র্কে থাকা জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনার মজুতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংক আপাতত নিউইয়র্ক থেকে তাদের সোনার মজুত সরিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানুয়ারিতে জার্মানির সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এআরডিকে বুন্দেসব্যাংক জানিয়েছিল, নিউইয়র্ক ফেড তাদের সোনা সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।