ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ পুনর্বহালের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর কয়েক ঘণ্টা পরই দেশটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে বাহরাইন, জর্ডান এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। এসব ঘটনায় একজন নাবিক নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছে। ইরানের হামলার পর পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টাপাল্টি হামলা ঘটেই চলেছে।
এদিকে, এই হামলার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দামও বেড়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৪ ডলারের বেশি হয়েছে। যদিও যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র সময়ে দাম প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল, তবুও এ মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ভিত্তিতে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতিও আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ৬০ দিনের ওই চুক্তির প্রায় অর্ধেক সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ওই সমঝোতায় ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
হরমুজ প্রণালিতে টোল আদায় নিয়ে ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা আবু মুসা, বান্দার আব্বাস, বুশেহর, চাবাহার, জাস্ক এবং কোনারাক এলাকার আশপাশে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানও এসব এলাকায় হামলার বিষয় স্বীকার করেছে। তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, এই হামলাগুলো ইরানি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক মানুষ ও বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা কমে যাবে।
সামরিক বাহিনীর ঘোষণার কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় হামলা। আমরা তাদের ওপর খুব কঠোরভাবে আঘাত হানছি। এই অভিযান চলতে থাকবে। এরপর কী হয়, সেটা দেখা যাবে। আমরা তাদের সব ধরনের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছি এবং প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নিচ্ছি। আমরা সেখানে আবারও অবরোধ কার্যকর করছি।’
ট্রাম্প আরও জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়ে তিনি নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এর আগে তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। এতে আমাদের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। তাই এই অঞ্চলে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে আমাদের অর্থ দিতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক। এতদিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার পক্ষে ছিল এবং সেখানে কোনো ধরনের টোল বা ফি আরোপের বিরোধিতা করে এসেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগ পর্যন্তও সেই নীতি বহাল ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান যে পক্ষই হোক, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অবাধ নৌচলাচলের নীতির লঙ্ঘন হবে। এতে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উল্লেখ্য, বারবারি যুদ্ধ এবং ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ নৌচলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আবারও হামলা শুরু
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে ইরান হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নাবিক নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছেন।
দেশটির মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ‘মোম্বাসা’ ও ‘আল বাহিয়াহ’ নামের দুটি ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। হামলার পর দুটি জাহাজেই আগুন ধরে যায়। তবে পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। এক বিবৃতিতে তারা দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ দুটি একটি মাইন পাতা এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল। এরপর তাদের লক্ষ্যবস্তু করে অচল করে দেওয়া হয়েছে। জাহাজ দুটিকে বারবার সতর্ক করার পরও নির্দেশনা উপেক্ষা করছিল।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহত নাবিক একজন ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া আহতদের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় ও দুজন ইউক্রেনের নাগরিক রয়েছেন।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজেদের ভূখণ্ড ও জণগণের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
এর আগেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিল আমিরাত। মঙ্গলবার সকালে দুবাইয়ের আকাশে যুদ্ধবিমানের শব্দও শোনা গেছে।
এদিকে, আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বুধবার পর্যন্ত সব ধরনের কনস্যুলার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করা হয়েছে।
অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে মঙ্গলবার ভোরে বাহরাইনেও নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরান।
হামলার সময় বাহরাইনে তিন দফা ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কসংকেত বাজানো হয় এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়। তবে এ হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, জর্ডানের সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পেত্রা জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশটি ইরানের হামলারও শিকার হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে ইরান
সোমবার রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক হিউ হিউইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, গত মাসে হওয়া চুক্তি ইরানকে পরীক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আপনি যখন প্রতারকদের সঙ্গে কাজ করেন, তখন চুক্তির তেমন কোনো মূল্য থাকে না। তবে তারা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।’
অন্যদিকে, ইরান দাবি করেছে, অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজন হলে ফি আদায়ের অধিকার তাদের রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবির বিরোধিতা করছে।
ইরানের অভিযোগ, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ওমান উপকূল ঘেঁষে এমন একটি বিকল্প নৌপথ চালুর চেষ্টা করেছে, যা ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে।
তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করছে। তাই ইরান ওই বিকল্প নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। এরপর ইরানও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আরব দেশগুলোর ওপর হামলা শুরু করে।
সাম্প্রতিক এসব পাল্টাপাল্টি হামলা অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ওই চুক্তির অংশ হিসেবে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যে অবরোধ তুলে নিয়েছিল, তা আবারও পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা আবারও ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ পুনর্বহাল করছি। অন্য সব দেশ হরমুজ প্রণালি ন্যায্য ও উন্মুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে ব্যয় হবে, তার খরচ ওঠাতে যুক্তরাষ্ট্র পণ্যবাহী জাহাজের কার্গোর মূল্যের ২০ শতাংশ পরিমাণ অর্থ টোল পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দুবাইয়ের স্থানীয় সময় বুধবার মধ্যরাত থেকে ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ আবারও কার্যকর করা হবে।