দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁপে, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, ডালসহ মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশকালে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম বাজেট।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ে নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছিল। গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নেওয়া এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে স্বাস্থ্য খাতেও কর ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানিকৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের সরবরাহে বিদ্যমান উচ্চ উৎসে করের কারণে এ খাত এখনও অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়ে গেছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসাটিকে আনুষ্ঠানিক খাতে এনে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে করের ৫ শতাংশ হার সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি ও কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ এবং রিফাইনারি কর্তৃক জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ১.৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রিসাইকেলড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামালের ওপর করহার ৩ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানোর পাশাপাশি বিটিআরসি কর্তৃক প্রাপ্ত রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জের ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হারও ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয় কমাতে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে অগ্রিম করের সাধারণ হার ৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ অনিবাসী করদাতাকে প্রদেয় অর্থের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ১৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশে কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে বিমা খাতে রি-ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম বাবদ ব্যয় কমাতে অনিবাসী করদাতাকে পরিশোধিত বিমা প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে হ্রাস এবং শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে করের হার ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব পদক্ষেপ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ বাড়াবে, ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাবে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করবে। এর ফলে শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।