ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার দুই সংসদীয় আসনের নির্বাচনি মাঠ দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে সরগরম গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা। উঠান বৈঠক, পথসভা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা—কোনো দিক থেকেই প্রচারণায় ঘাটতি রাখতে চান না প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
প্রচারণায় প্রার্থীরা অঙ্গীকার করছেন, নির্বাচিত হলে চুয়াডাঙ্গাকে সন্ত্রাস, মাদক ও টেন্ডারবাজিমুক্ত একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলবেন। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও জেলার দুই আসনে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে দলটির কর্মী-সমর্থক ও নিরপেক্ষ ভোটাররা।
চুয়াডাঙ্গা-১: বিএনপির ঘাঁটিতে দ্বিমুখী লড়াই
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০০৮ সালে এখানে আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি নির্বাচনে বিতর্কের মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয় পান।
এবার এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন তিন প্রার্থী। ধানের শীষ প্রতীকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ, জামায়াত ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল এবং হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার সহ-সভাপতি মাওলানা জহুরুল ইসলাম আজিজী।
গণসংযোগে বিএনপি প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই করে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এসেছি। এবারের নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আমরা শুধু নিজেদের পক্ষে ভোট চাইছি না, সব দলের, এমনকি নির্দলীয় ভোটারদেরও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। ভোট কাকে দেবেন সেটাই মুখ্য নয়, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোট পড়লে সেটিই বড় সাফল্য হবে।’
তিনি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অবহেলিত চুয়াডাঙ্গাকে উন্নয়নের শিখরে নেওয়ার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, ‘দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গাকে একটি রোল মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’
হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী জহুরুল ইসলাম আজিজী বলেন, ‘বড় দলগুলোর রাজনীতির বাইরে গিয়ে আমরা পরিষ্কার ভাবমূর্তির নেতৃত্ব দিতে চাই। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি।’
তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিএনপির শক্ত অবস্থানের কারণে জামায়াতের জয় কঠিন হলেও তারা সম্মানজনক ভোট ও নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৩ হাজার ৭১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০৪ জন, নারী ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৮ জন।
চুয়াডাঙ্গা-২: জামায়াত অধ্যুষিত আসনে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা
দামুড়হুদা, জীবননগর ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনটি জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। অতীতে এখানে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই জয় পেয়েছে।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজিএমইএর সভাপতি, দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি নির্বাচিত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে তার ব্যক্তিগত ইমেজ এই আসনে আলোচিত বিষয়।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘নির্বাচিত হলে কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, খাদ্য হিমাগার স্থাপন, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।’
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য, আয়কর আইনজীবী রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। আওয়ামী লীগের সকল বাধা উপেক্ষা করে ২০১০ সাল থেকে তিনি এ আসনে কাজ করছেন। জেল-জুলুম, হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে এলাকায় অবস্থান করে দলকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকায় তাকে হারানো সহজ হবে না।
রুহুল আমিন বলেন, ‘এই জনপদের মেঠো পথেই আমার বেড়ে ওঠা। মানুষের চাওয়া-পাওয়া আমি জানি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্থলবন্দর বাস্তবায়ন, কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আধুনিকায়ন, চুয়াডাঙ্গা–কালীগঞ্জ সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণসহ সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই।’
এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাসানুজ্জামান সজীব বলেন, ‘সিদ্ধান্তহীন ভোটাররাই এবার বড় ফয়সালা দেবেন। আমি নির্বাচিত হলে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়তে কাজ করব। আমার বিশ্বাস মানুষ হাতপাখার প্রতি বিশ্বাস রাখবেন।’
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯২ হাজার ৩৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩১ জন, নারী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৫ জন।
নেতৃত্বহীন ও নিরপেক্ষ ভোটারই বড় নিয়ামক
এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রধান লক্ষ্য নিজেদের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের বাইরে থাকা ভোটাররা। বিশেষ করে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটাররা। দলীয় প্রার্থী না থাকায় এই ভোটারদের একটি অংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাতে মরিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
চুয়াডাঙ্গা শহরের এক ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দল নেই, তাই ভাবছি কাকে ভোট দিলে এলাকার জন্য ভালো হবে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেব।’
একই ধরনের কথা শোনা গেছে আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী গ্রামেও। সেখানকার এক ভোটার বলেন, ‘তিন প্রার্থীর মধ্যে কাউকে না কাউকে ভোট দিতে হবে। কিন্তু কাকে দেব, এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় আছি।’
একই কথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও মুখেও। তাদের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ মাঠে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের সমর্থক ভোটাররা এখনও বড় ফ্যাক্টর।
চুয়াডাঙ্গা শিক্ষাবিদ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাবেক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী বলেন, ‘এটা আসলে নিজস্ব ভোটব্যাংকের নির্বাচন নয়, এটা মন জয়ের নির্বাচন। শেষ মুহূর্তে কে কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন, সেটাই ফল নির্ধারণ করবে।’
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজমুল হক স্বপন বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে এবারের জয়পরাজয়ে নিয়ামক ভূমিকায় থাকবে নেতৃত্বহীন ও নিরপেক্ষ ভোটার। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত ইমেজ ও জনসম্পৃক্ততাও বড় প্রভাব ফেলবে। শুধুমাত্র দলীয় ভোট ব্যাংক দিয়ে বৈতরণী পার হওয়া যাবে না। বিশেষ করে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যায়, সেটাও হতে পারে জয়-পরাজয়ের টার্নিং পয়েন্ট।
সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট যত ঘনিয়ে আসছে, ততই চুয়াডাঙ্গার দুই আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিএনপি হারানো আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া, জামায়াতে ইসলামী নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে, আর বিকল্প রাজনীতির বার্তা নিয়ে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ছুটছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।